কোড পরিবর্তনের চেষ্টা করলেই ধরবে ‘প্রযুক্তিজাল’

TEacher20160411170230

দেশ ডেস্ক:   জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পর এমপিওভুক্তি এবং কোড পরিবর্তন ঠেকাতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার শুরু করছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।

শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ বা এমপিও দিতে আগে অনলাইনের পাশাপাশি কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করলেও এখন পুরোপুরি অনলাইনে চলে এসেছে এই প্রক্রিয়া।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ইতোমধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে নখদর্পণে আনা হয়েছে পুরো এমপিও প্রক্রিয়া।

আর কেউ অবৈধভাবে এমপিও এবং কোড পরিবর্তন বা এ সংক্রান্ত জালিয়াতি করার চেষ্টা করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়বে- সেজন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেল নিম্নতম থেকে অবৈধপথে উচ্চতর বেতন কোড গ্রহণের ফলে গত বছর সরকারের ক্ষতি হয় লাখ লাখ টাকা।

দেশব্যাপী শত শত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী একটি চক্রের মাধ্যমে অসাধু উপায়ে কোড পরিবর্তন করে ওই অর্থ তোলেন। অসাধু চক্রটি ঢাকার শিক্ষা ভবন থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত জালিয়াতি করেছেন বলে তদন্তে প্রমাণ পেয়েছে মাউশি। অসাধু চক্রগুলো শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকা।

মাউশি’র মাধ্যমিক শাখার কর্মকর্তারা বাংলানিউজকে জানান, ৩২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী কোড পরিবর্তন করেছেন। তাদের মধ্যে ২৯৬ জনই অতিরিক্ত টাকা তুলে নিয়েছিলেন। অবৈধভাবে নেওয়া মাধ্যমিকে এই টাকার পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ ৮৯ হাজার।

মাধ্যমিকে ১৫৯ জনের মধ্যে ১ জন, মাদ্রাসায় ১৬৪ জনের মধ্যে ৩ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ২ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

টাকা তুলেও ওই ৫ জনের কাছে কোনো জবাব না পাওয়ায় তাদেরকে এখন হয় টাকা ফেরত দিতে হবে, না হলে চতুর্থবার তাগাদা দিয়ে এখন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে মাউশি।

কর্মকর্তারা আরও জানান, যারা অবৈধ কার্যক্রম করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে চার ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কোড পরিবর্তন করে নেওয়া টাকা যারা ফেরত দিয়েছেন, তাদের বেতন অবনমন বা পূর্বের অবস্থানে ফেরত, মাঠ পর্যায়ের জড়িতদের বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দ্বিতীয়বার শো’কজ করে কেন স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়।

আর যারা এখনও টাকা ফেরত দেননি তাদের তাগিদ দিয়ে বিভাগীয় মামলা এবং চতুর্থ দফায় তাগাদা দেওয়া হবে।

গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কোড পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান মাউশি’র পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো. এলিয়াছ হোসেন।

এরপর তাকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কোড পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত ও সহায়তায় জড়িত থাকার জন্য ৮ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে মাউশি। তাদের এমপিও সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।

তারা হলেন- কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার আদর্শ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লুৎফর রহমান আশু ও চান্দামারী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মো. আহসান হাবীব, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ছোট উজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মো. রেজাউল করিম, পীরগঞ্জ কেএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইসলাম ধর্ম শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম, হোসেনপুর এমইউ দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. নুরুল হক ও সহকারী মৌলভী মো. আব্দুল জলিল মিয়া, বড় আলমপুর দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপার মো. কাদির ওরফে আতাউর রহমান এবং গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার মাদারহাট আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মশিউর রহমান।

ওই আটজনের এমপিও স্থায়ীভাবে কেন স্থগিত করা হবে না, তার জন্য শো’কজ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া মাউশি’র কম্পিউটার সেলের (এএমআইএস) সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবুল ফজল মো. বিল্লাল হোসেনকে অব্যাহতি ও পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানান তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক এলিয়াছ।

ইএমআইএস থেকে যেকোনো ভাবে কোড পরিবর্তন হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক এলিয়াছ বলেন, পুরো চক্রকে ধরতে না পারলেও বেশ কয়েকজন চিহ্নিত হয়েছেন।

জালিয়াতি ঠেকাতে পুরোপুরি অনলাইনের পাশাপাশি এখন মাধ্যমিকে ২৬ হাজার প্রতিষ্ঠান ছয়জনের বদলে ৫১৩ জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার হাতের মুঠোয় চলে গেছে।

অনলাইন এবং অফলাইনে (কাগজপত্র দিয়ে) এমপিও করার কারণে সমস্যাটা হয়েছে জানিয়ে এলিয়াছ হোসেন বলেন, এখন ইআইএমএস সেলে মাত্র একজন কাজ করছেন।

সারা দেশের নয়টি অঞ্চল থেকে আসা এমপিও’র তথ্য তার হাত দিয়ে প্রক্রিয়াকরণ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এখন এমপিও অঞ্চলে অঞ্চলে চলে গেছে। আবার কেন্দ্র থেকে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এতে কোনো সমস্যা হলে একজনই দায়ী হবেন।

জালিয়াতি ঠেকাতে নিয়মিত সময়ে ডিজিটাল জরিপ করা হবে বলেও জানান মাউশির কর্মকর্তারা।

এলিয়াছ হোসেন বলেন, অধিদফতরের কম্পিউটার শাখায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অনলাইনে একজনই সব কাজ করছেন। এতে আরও নিরাপত্তা এসেছে। একজন কোথাও কোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম আসবে।

সর্বশেষ গত জানুয়ারি পর্যন্ত মোট এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার ৮৪টি এবং শিক্ষক-কর্মচারী ৪ লাখ ৮০ হাজার ৯২২ জন। এর মধ্যে শিক্ষক ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩১৯ জন ও কর্মচারী ১ লাখ ১ হাজার ৬০৩ জন।

এছাড়া নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য আরও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানান এলিয়াস হোসেন।

আর এ সংক্রান্ত একটি মামলা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছে।

-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like