উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিশুকে মাটি গর্তে পুঁতে মুক্তিপণ দাবির ভিডিও ভাইরাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিশুটির বয়স অনুমানিক ৬ বছর। শরীরের গলা থেকে নিচের অংশ মাটির একটি গর্তে পুঁতে রাখে। শিশুটির চোখে-মুখে ভয়। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা ভাষায় শিশুটি তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিল, ‘আব্বা তরাতরি চেষ্টা গর। মরে গাতত গলায় পিল্লে। টিয়া দে। (বাবা দ্রুত চেষ্টা কর, আমাকে গর্তে পুঁতে ফেলেছে, টাকা দাও)।’

এমন একটি ভিডিও বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এর পরপরই ভিডিওটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। নানা উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশ করতে থাকেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

আর সেই ভিডিও উৎস জানতে পুলিশ, রোহিঙ্গা নেতা সহ একাধিক জনের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, ১৫ সেকেন্ডের এই ভিডিও ১০ জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার অজ্ঞাত স্থানে ধারণ করা। ভিডিওর শিশুটির নাম মোহাম্মদ আরাকান (৬)। সে থাইংখালী-১৯ নম্বর রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি ১৫ ব্লকের বাসিন্দা আবদুর রহমান ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে। ৮ জানুয়ারি আরাকান ক্যাম্পের খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয়। এরপর ১০ জানুয়ারি তার মা–বাবা এই ভিডিও বার্তা পান।

নিখোঁজ আরাকানের সন্ধানে এর আগেই তার মা–বাবা থানায় জিডি করেছিলেন। ভিডিও বার্তা পাওয়ার পর তাঁরা নিশ্চিত হন, তাঁদের ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে।

অপহরণকারীরা আরাকানের মুক্তির বিনিময়ে সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণকারীদের কথা অনুযায়ী দেখিয়ে দেওয়া স্থানে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন আরাকানের স্বজনেরা। এতেও আরাকানকে না ছাড়ায় ধারদেনা করে আরও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেন তাঁরা। ১৪ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুতুপালং এলাকার এমএসএফ হল্যান্ড হাসপাতালের সামনে শিশুটিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে দিয়ে চলে যায় সন্ত্রাসীরা।

শিশুটির বাবা আবদুর রহমান বলেন, ৮ জানুয়ারি বেলা দুইটার দিকে এপিবিএন অফিসসংলগ্ন খেলার মাঠে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি আরাকান। দুই দিন ধরে আরাকানের সন্ধানে তাঁরা বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরেছেন। পুলিশের কাছেও গেছেন। এপিবিএনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। এরপর ১০ জানুয়ারি দুটি মুঠোফোন (০১৭৬-৬৫৭৫৪৬৬ ও ০১৮৯৮–৮২১৪২৯) নম্বর থেকে কল দিয়ে বলা হয়, তাঁর ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছাড়িয়ে নিতে হলে সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। টাকা না পেলে ছেলেকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেন তাঁরা।

আবদুর রহমান আরও বলেন, ‘অপহরণকারীরা দাবি করা টাকার জন্য ছেলেকে মাটিতে পুঁতে রেখে ভিডিও করে। আমার স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা পাঠাই। এরপরও তাকে না ছাড়ায় ক্যাম্পের আত্মীয়স্বজনসহ অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাঠাই। ১৪ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে এমএসএফ হাসপাতালের সামনে আরাকানকে ফেলে যায় তারা।’

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন বলেন, শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে অনেক ব্যবহারকারী টেকনাফ-উখিয়া এলাকার সাম্প্রতিক অপহরণ বাণিজ্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের তথ্য বলছে, গত এক বছরের বেশি সময়ে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৯৩ জনকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে একই সময়ে উখিয়ায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে ৮৬ জনকে অপহরণ করা হয়।

nupa alam

Recent Posts

লোকে-লোকারণ্য সমুদ্র সৈকত

নিজস্ব প্রতিবেদক : কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের জন প্রিয় স্পট সুগন্ধ পয়েন্ট; যেখানে সারা বছর পর্যটকের…

3 days ago

বাংলাদেশের রাষ্ট্রের যত বড় কর্তাই হউক তাদেরকে জনগনের কাছে জবাবদিহিতা করতেই হবে : সালাহউদ্দিন আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাষ্ট্রের যত বড় কর্তাই হউক বা প্রতিষ্ঠান হউক তাদেরকে জনগনের কাছে…

3 days ago

চকরিয়ায় হাতির আক্রমণে নারীর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক : চকরিয়ায় তামাক চুল্লীতে জ্বালানি দিতে গিয়ে বন্যহাতির আক্রমণে এক নারী নিহত হয়েছে।…

4 weeks ago

টেকনাফে অপহৃত উদ্ধার : অস্ত্র সহ চক্রের ৩ সদস্য আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক : টেকনাফে নৌবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে এক অপহৃতকে উদ্ধার এবং তিন…

4 weeks ago

টেকনাফের ‘ডাকাত খায়ের’ সহযোগী নারী সহ গ্রেপ্তার

টেকনাফ প্রতিবেদক : টেকনাফে পুলিশ ও নৌবাহিনী যৌথ অভিযানে এক নারী সহযোগীসহ কুখ্যাত ডাকাত আবুল…

4 weeks ago