রামুর খুলিয়াপালংয়ে মাদ্রাসায় এতিমের টাকা আত্মসাত : এলাকায় তোলপাড়

atto

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৫ মে: রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নে একটি মাদ্রাসায় এতিমের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় অভিযুক্ত দুই মাদ্রাসা শিক্ষককে গণধোলাই দিয়েছে এলাকাবাসি।
সূত্রমতে, রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নে এতিমদের জন্য চার লাখ টাকার অনুদান দেন মধ্যপ্রাচ্যের দুইজন ব্যক্তি। দানের ওই টাকা গুলো বিতরণের কথা ছিল খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৬, ৭, ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের চারটি মাদ্রাসার ২০০ জন এতিমকে। এই টাকা বিতরণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দুই ব্যক্তি সহায়তা নেন ৭নং ওয়ার্ডের পূর্ব গোয়ালিয়া পালং এলাকার ‘পাহাড় পাড়া মাদ্রাসার’ প্রধান মাওলানা আব্দুস শুক্কুর ওরফে বার্মাইয়া হুজুর ও শীর্ষ জঙ্গিনেতা মাওলানা আয়াছের ভগ্নিপতি খুনিয়াপালং ইউনিয়নের বহু বিতর্কিত মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল খালেকের।
গত শনিবার টাকা গুলো বিতরণের জন্য কক্সবাজার আসে মধ্যপ্রাচ্যের ওই দুই ব্যক্তি। একটি মাদ্রাসায় সরাসরি বিতরণের ইচ্ছা প্রকাশ করে তারা। সে অনুযায়ী পূর্ব গোয়ালিয়া পালং এলাকার ‘পাহাড় পাড়া মাদ্রাসায়’ এতিমদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে টাকা বিতরণের আয়োজন করা হয়। শনিবার দুপুরে মধ্যপ্রাচ্যের ওই ব্যক্তি ৪৮ জন এতিমদের হাতে প্রতিজনকে দুই হাজার টাকা করে তুলে দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ওই ব্যক্তি সবার সামনে এতিম শিশুদের হাতে টাকা তুলে দিলেও তাঁরা চলে যাওয়ার পর পরই মাত্র ১০০ টাকা করে রেখে বাকি টাকা গুলো শিশুদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন মাওলানা আব্দুল খালেক ও বার্মাইয়া হুজুর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাহাড় পাড়া মাদ্রাসার এক এতিম শিশু জানায়, দুইজন বিদেশি লোক তাদের প্রতিজনকে দুই হাজার টাকা করে দেয়। বিদেশিরা টাকা গুলো দেওয়ার সময় হুজুরেরা বলেছিল টাকা গুলো তাদের ব্যক্তিগত খরচের জন্য দান করা হচ্ছে। কিন্তু বিদেশিরা চলে যাওয়ার পর পরই মাত্র ১০০ টাকা করে রেখে বাকি টাকা গুলো তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয় বার্মাইয়া হুজুর ও আব্দুল খালেক। পরে অনেকে টাকা দাবী করলে মারধরের হুমকি দেয় অভিযুক্ত দুই মৌলভী।
সে আরো জানায়, পাহাড়পাড়া মাদ্রাসায় মাত্র কয়েকজন এতিম ছাত্র রয়েছে। টাকা বিতরণের দিন অন্যান্য মাদ্রাসা থেকে এতিম নিয়ে এসে ৪৮ জন করা হয়েছিল।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে স্থানীয়দের রোষানলে পড়েন অভিযুক্ত দুই মৌলভী। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তাক আহমদের হস্তক্ষেপে রেহায় পায় তারা। ওই বিষয়টি নিয়ে গতকাল রোববার মেম্বারের কাছে শালিস হওয়ার কথা ছিল।
ওই শালিসের বিষয়ে জানার জন্য গতকাল রোববার রাত আটটার দিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তাক আহমদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তাক ও এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা তৎপর হয়ে উঠেছে। শালিসের নামে ঘটনাটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ গেছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
এলাকাবাসি বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান অবগত আছে জানালেও গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে খুনিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মাবুদ ভিন্ন কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম আপনার (প্রতিবেদক) কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছি। আমি আসলে এলাকায় ছিলাম না। খোঁজ খবর নেব’।
সূত্রমতে, মধ্যপ্রাচ্যের ওই দুই ব্যক্তির কাছে মাওলানা আব্দুল খালেক ও আব্দুস শুক্কুর হিসাব দিয়েছিল প্রতি মাদ্রাসায় ৫০ জন করে চার মাদ্রাসায় ২০০ জন এতিম ছাত্র রয়েছে। সে হিসাবে মাথাপিছু দুই হাজার টাকা করে প্রতি মাদ্রাসার জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল তারা। অর্থাৎ চার মাদ্রাসার জন্য চার লাখ টাকা। কিন্তু সব মাদ্রাসা মিলিয়ে এতিম ছাত্র রয়েছে মাত্র ৬০ জনের মত। টাকা বিতরণের দিন চার মাদ্রাসা থেকে ৪৮ জন এতিম শিশু নিয়ে এসে পাহাড় পাড়া মাদ্রাসার ভুয়া রেজিষ্টার খাতায় নাম লেখায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাহাড় পাড়া মাদ্রাসার এক শিক্ষক জানান, ২০০ জন এতিম শিশু দেখালেও চার মাদ্রাসা মিলে প্রকৃত পক্ষে সর্বোচ্চ এতিম শিশু থাকবে ৬০ জন। পাহাড়পাড়া মাদ্রাসায় ওইদিন অন্যান্য মাদ্রাসা থেকে এতিমদের সংগ্রহ করে নিয়ে এসে ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে উল্লেখ করেছিল আব্দুল খালেক ও বার্মাইয়া হুজুর। মিথ্যা নাটক সাজিয়ে পুরোপুরি তিন লাখ টাকা খেয়েও তারা ক্ষান্ত হয়নি। ওই বিদেশি ডোনারেরা চলে যাওয়ার পর পরই ৪৮ জন এতিমের কাছে বিতরণ করা টাকা গুলোও ছিনিয়ে নেয় তারা। মাত্র ১০০ টাকা করে ধরিয়ে দেন এতিমদের। এতিমের টাকা আত্মসাত করতে তারা এতটুকু দ্বিধাবোধ করেননি। টাকা ছিনিয়ে নিয়ে উল্টো এতিমদের মুখ না খোলার হুমকি ধমকি দিচ্ছে আব্দুল খালেক ও বার্মাইয়া হুজুর।
তিনি আরো জানান, সারা বছর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ডোনার নিয়ে আসে মাওলানা আব্দুল খালেক ও বার্মাইয়া হুজুর। বিশেষ করে সেই ডোনার গুলো আসে জঙ্গিনেতা মাওলানা আয়াছের মাধ্যমে। আব্দুল খালেক জঙ্গি আয়াছের ভগ্নিপতি। কিন্তু দানের টাকা প্রতিবারই প্রকৃতপক্ষে এতিম শিশুরা পায় না। কোন না কোন নাটক সাজিয়ে টাকা গুলো তারা দুইজনে আত্মসাত করে। এছাড়াও প্রতি মাসে নতুন নতুন মানুষ মাদ্রাসায় এসে বার্মাইয়া হুজুর ও আব্দুল খালেকের সাথে গোপন বৈঠক করেন। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই কারও।
একটি সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাঁরা টাকা দান করতে আসে এদের বেশির ভাগই জঙ্গিঅর্থ যোগানদাতা। অল্পকিছু টাকা মাদ্রাসার এতিম শিক্ষার্থীদের বিতরণ করার নামে মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে মোটা অংকের জঙ্গি অর্থায়ন করে তারা। জঙ্গি অর্থায়নের ওই টাকা বিতরণের দায়িত্বে থাকে শীর্ষ জঙ্গি মাওলানা আয়াছ, তাঁর ভগ্নিপতি মাওলানা আব্দুল খালেক ও বার্মাইয়া হুজুর। তবে এতিমদের কাছে বিতরণের টাকাও চয়ে যায় তাদের পেটে।
সূত্রমতে, কয়েক মাস আগে খুনিয়াপালং ইউনিয়নে জঙ্গি আয়াছ পরিচালিত বহু বিতর্কিত মাদ্রাসায় কিছু অপরিচিত মানুষ আসে। তাঁরা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের নামে আরএসও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেয়। দিন দিন তাদের কার্যক্রম বেড়ে যায়। পরে বিষয়টি সন্দেহজনক হলে স্থানীয় এলাকাবাসি ও প্রশাসনের তোপের মুখে গা ঢাকা দেয় তারা।
টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাওলানা আব্দুল খালেক বলেন, কোন ধরণের টাকা আত্মসাত হয়নি। একটি কুচক্রি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলে দাবী করেন তিনি।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like