ইটস আ পলিটিক্যাল গেইম: সিইসি

06_Kazi+Rakibuddin+Ahmad_CEC_Md+Pramanik_080217_0004জাতীয় ডেস্ক : নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সাফল‌্যের সঙ্গে মেয়াদ শেষ করার দাবি জাতির সামনে রেখে বিদায় নিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বর্জন-সহিংসতা-নৈরাজ্যের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না হলে দেশে অরাজক ও সাংবিধানিক সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হত।

ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বর্জনের বিষয়ে ইংগিত করে বিদায়ী সিইসি বলেন, “ইটস আ পলিটিক্যাল গেইম। পলিটিক্সে আপনি যদি নির্বাচনে না নামেন, লোক তো ফাঁকা মাঠে গোল করেই যাবে।”

বুধবার নির্বাচন ভবনে শেষ দিন অফিস করে সঙ্গী নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী ও মো. শাহনেওয়াজকে নিয়ে হাসিমুখে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে শেষ ব্রিফিংয়ে আসেন সিইসি কাজী রকিব।

এ সময় এক পাশে রাখেন ইসি সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমানকে। পরে ব্রিফিংয়ে যোগ দেন নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ; তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক উপস্থিত ছিলেন না।

উপস্থিত সাংবাদিকদের সম্ভাষণ করেই নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন কাজী রকিব। পাঁচ বছর মেয়াদে সাংবিধানিক এ দায়িত্ব পালনকালে কী কী কার্যক্রম নিয়েছেন, কীভাবে চ্যালেঞ্জ সামলেছেন তার বিবরণ তিনি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “শপথ নেওয়ার পরই আমি বলেছিলাম কাজে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করব। ৫ বছর মেয়াদে আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি এবং তা সফলভাবে অতিক্রম করেছি। কখনো কোনো ধরনের চাপ পাইনি। আজ বলতে পারি, আমরা জাতির সামনে নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে পেরেছি।”

কাজী রকিবের এই কমিশন ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের পুরো মেয়াদই কেটেছে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও বৈরী পরিবেশের মধ্যে। সাড়ে সাত হাজার ভোট হয়েছে এই কমিশনের অধীনে, যার বেশিরভাগই সহিংসতা ও ব‌্যাপক কারচুপির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এর মধ‌্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়, কেবল ভোটের দিনই নিহত হন অন্তত ২১ জন। বিএনপি ও শরিকদের বর্জনের মধ‌্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ডও হয় ওই নির্বাচনে।

এ বিষয়ে সাবেক সিএসপি কর্মকর্তা কাজী রকিব বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি আইনেই রয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশের আইনেও সেই সুযোগ আছে। এতে নির্বাচন কমিশনের ‘করার কিছু নেই’।

তিনি দাবি করেন, ওই সময় নির্বাচন করা না গেলে দেশে যে ‘অরাজক সংকট, অসাংবিধানিক পরিস্থিতির’ সৃষ্টি হত, তা কেউ ‘কল্পনাও করতে পারবে না’।

“সব ধরনের প্রচেষ্টা পরও যখন সমঝোতায় পৌঁছানো গেল না, তখন শেষ মুহূর্তে আর কোনো উপায় না থাকায় জাতির ওই ক্রান্তিলগ্নে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যে যেসব রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের পক্ষে ছিল, তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন করা ছাড়া আমাদের আর কোনো গণতান্ত্রিক পথ খোলা ছিল না।”

ভোট বর্জনকারী দলগুলোর নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টার কারণে সে সময় জানমালের ক্ষতির বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে কাজী রকিব বলেন, “এ রকম সহিংস পরিবেশে নির্বাচন পরিচালনা করা কী যে দুষ্কর, তা খুব কম লোকই অনুধাবন করতে পারবেন।”

তবে সবকিছুর পরও ‘অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সফল হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

মেয়াদের শুরুতে চার সিটি করপোরেশন ও শেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন ছাড়া এ কমিশনের অধীনে হওয়া উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনগুলো গোলযোগ-সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে পর্যবেক্ষকদের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ‌্যতা পায়নি।

তবে কাজী রকিব বিদায়ের আগেও দাবি করেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ নির্বাচন ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ’ হয়েছে।

নিজেদের মেয়াদে ইভিএম বন্ধের পর পুনরায় তা চালু করতে না পারা, নিজেদের ক্ষমতা (আরপিও ৯১ ই ধারা বাতিল) কমানোর অভিপ্রায়, ইসিতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ ও মাঠ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে বিদায়ী ইসিকে।

মেয়াদের শুরুতে সংলাপ করলেও পরে আর সে ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণেও কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে।

বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অনেক দলই এ কমিশনের সমালোচনায় মুখর ছিল পুরোটা সময়। বিএনপি শুরু থেকেই কাজী রকিবের কমিশনকে ‘সরকারের আজ্ঞাবহ’ বলে এসেছে। এরপর জাতীয় পার্টিও বিদায়ী ইসিকে ‘মেরুদণ্ডহীন’ আখ‌্যা দিয়েছে। অবশ‌্য সেসব মন্তব্যকে ‘রাজনৈতিক’ বলে উড়িয়ে দিতেন সিইসি।

নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার সমালোচনার মধ্যে একটি ইউপি ভোটকে কেন্দ্র করে পুরো নির্বাচন কমিশনকে আদালতে গিয়ে ক্ষমাও চাইতে হয়েছে।

তবে কাজী রকিবের দাবি, সমালোচনার মধ্যে তার কমিশন সবসময় ‘সতর্ক’ ছিল, সব সময় ‘নিরপেক্ষভাবে’ কাজ করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ইতোমধ‌্যে সার্চ কমিটির সুপারিশ থেকে পাঁচজনকে নতুন ইসির জন‌্য মনোনীত করেছেন। এই কমিশনে সিইসি কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে থাকছেন সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী।

নতুন ইসির জন‌্য শুভকামনা রেখে বিদায়ী সিইসি বলেন, “নতুন ইসি সদস্যরা অভিজ্ঞ ও সম্মানিত ব্যক্তি। কাজের মধ্য দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত।”

কাজী রকিবের সঙ্গে তিন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, আবু হাফিজ ও জাবেদ আলীর পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হল বুধবার। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মেয়াদ শেষ করবেন।

আর কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি ১৫ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েই যোগ দেবেন ইসিতে; তাদের অধীনেই হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন।

সূত্র : বিডিনিউজ।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like