ইসি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের: বিএনপি

Khaleda-edরাজনীতি ডেস্ক : সাবেক সচিব কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে ‘নিরাশ ও হতাশ’ বিএনপি বলছে, এই নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ পাঁচ সদস‌্যের নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের পরদিন মঙ্গলবার রাতে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একথা বলেন।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে অসন্তোষ জানালেও কোনো কর্মসূচি দেয়নি বিএনপি জোট। মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা মনে করি, একজন বিতর্কিত সাবেক সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।

“কাজেই এই সিইসির নেতৃত্বে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না।” মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা নূরুল হুদাকে বিএনপির শাসনামলে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালত পরে বিএনপি সরকারের ওই আদেশ বেআইনি ঘোষণা করে। পরে তিনি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়ে সচিব হন এবং সব ধরনের আর্থিক সুযোগ সুবিধা লাভ করেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরাগভাজন এই কর্মকর্তার সে সময় দায়িত্ব পালন করতে না পারার কথা উল্লেখ করেছেন মির্জা ফখরুল। তখনকার প্রতিমন্ত্রী ফখরুলের ভাষ‌্যমতে, নুরুল হুদা যুগ্ম সচিব হিসেবে চাকরি জীবন শেষ করেন।

“অতিরিক্ত সচিব ও সচিব হয়েছেন শুধুই কাগজে। প্রকৃতপক্ষে তিনি একদিনের জন্যও অতিরিক্ত সচিব কিংবা সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাই।”

“ফলে এসব পদে দায়িত্ব পালনে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা তার নেই। অভিজ্ঞ সচিব ছাড়া সিইসি নিয়োগের এই ঘটনা অভূতপূর্ব। রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এমন হওয়ার কথা নয়।” নূরুল হুদাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব পালনকালে তার মধ‌্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, “এর ফলে আমাদের দল সম্পর্কে তার (নুরুল হুদা) মনে ক্ষোভ থাকতে পারে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতে পারেন।

“এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি কতটুকু নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবেন, সে ব্যাপারে জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। একটি নির্বাচন কমিশনের যাত্রার শুরুতে আস্থার সংকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে।”

১৯৯৬ সালে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক থাকাকালে নুরুল হুদা জনতার মঞ্চের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, “এমন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া সরকারি চাকরি বিধির নিদারুণ লংঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”

এছাড়া সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০১০ সাল থেকে তার বাংলাদেশ মিউনিসিপাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিএনপির।

“আমরা যে ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তাতে আমরা বলেছি, সরকারি চাকরি শেষে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিতদের ইসিতে অন্তর্ভুক্ত না করতে। কারণ এজন্য যে, সরকারের অনুগ্রহভাজনদেরই এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমরা চেয়েছিলাম, কারও কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কিংবা কারও প্রতি ক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাই হয়েছে।”

অন‌্য নির্বাচন কমিশনারদের সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “অন্যান্যদের বিষয়ে জাতির সামনে আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে আসবে। সিইসি সম্পর্কে যদি এই অভিযোগ থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের কী অবস্থা দাঁড়াচ্ছে তা আমরা সকলে বুঝতে পারছি।”

কমিশনারদের মধ‌্যে মাহবুব তালুকদারের নাম বিএনপি দিয়েছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।

বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ইসি নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করেন।

সার্চ কমিটি কাজ শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের পছন্দের ব‌্যক্তিদের নাম চায়। দলগুলোর দেওয়া নাম থেকে ১০ জনকে বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করে সার্চ কমিটি, সেখান থেকে সোমবার পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করেন মো. আবদুল হামিদ।

এই কমিশনে সিইসি নূরুল হুদার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে আছেন সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী।

এই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিএনপির। ফখরুল বলেন, সার্চ কমিটির বাছাই করা ১০ জনের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ এবং তাদের জীবন বৃত্তান্ত ও কর্ম অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করার প্রস্তাব উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে।

“এই পন্থা অনুসরণ করা হলে প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা পেত। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা নিরাশ ও হতাশ হয়েছি।”

কমিশন গঠনে শেষ মুহূর্তে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দাবি করে বিএনপির মুখপাত্র বলেন, এটা অনেক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

“এসব সন্দেহের মধ্যে একটি বড় সন্দেহ হল-কাদের নির্বাচন কমিশনে রাখা হবে, সেটি ছিল শাসক মহলের পূর্বপরিকল্পিত। সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করতে পারবে। সঙ্গত কারণেই আমরা মনে করতে পারি, বর্তমান ইসি গঠনে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেরই প্রতিফলন ঘটেছে।”

সোমবার নির্বাচন কমিশন গঠনের পর রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস‌্যদের সঙ্গে খালেদা জিয়া বসলেও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি তারা।

মঙ্গলবার রাতে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

রাত ৯টায় গুলশানে নিজের কার্যালয়ে জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন খালেদা জিয়া।

বৈঠকে এলডিপির অলি আহমেদ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জামায়াতে ইসলামীর আবদুল হালিম, জমিয়তে উলামে ইসলামের মাওলানা নুর হোসাইন কাশেমী, মুফতি আবদুর রব ইউসুফী, ইসলামী ঐক্যজোটের এম এ রকীব, খেলাফত মজলিশের সৈয়দ মজিবুর রহমান, বিজেপির সালাহউদ্দিন মতিন প্রকাশ, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এনডিপির খোন্দকার গোলাম মূর্তজা, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপের জেবেল রহমান গানি, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, ভাসানী ন্যাপের আজহারুল ইসলাম, ইসলামিক পার্টির আবুল কাশেম চৌধুরী, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ, ডিএল’র সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি প্রমুখ ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ছাড়াও মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান সভায় উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র : বিডিনিউজ।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like