জৌলুস হারাচ্ছে মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির

নিজস্ব প্রতিবেদক, ০৬ ফেব্রুয়ারি : কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। এই দ্বীপকে ঘিরে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করেছে। কিন্তু পর্যটন শিল্পের জন্য বিখ্যাত এই দ্বীপ এখনো উন্নয়নের আওতায় আসেনি। অথচ নানা কারণে এই দ্বীপ বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের অসংখ্য পর্যটকদের কাছে অতি পরিচিত নাম। কিন্তু, যথাযত সংস্কার ও উদ্যোগের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে এই মন্দিরটি।

মহেশখালী পৌর সদর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তরে আদিনাথ পাহাড়ে অবস্থিত মৈনাক পর্বত চূঁড়া নামক স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী তীর্থ মন্দির আদিনাথ। প্রতি বছর বসন্তের শুরুতে ১০দিন ব্যাপী শিব চতুর্দশী পুজা ও মেলা চলে। এ মেলায় দেশী বিদেশী হাজার হাজার পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। হয়ে উঠে সার্বজনীন উৎসব।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ধারণা মতে, ৩ হাজার বছর পূর্বে ক্রেতাযুগে এ আদিনাথ মন্দিরের গোড়াপত্তন হয়। এখানে প্রতি বছর শিবমন্দিরে অনুষ্ঠিত প্রায় হাজার বছরের প্রাচীনতম মেলায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটক ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়। শিবমন্দিরের পাদদেশে নৈসর্গিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত আদিনাথ মেলায় বিশেষ করে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, মায়ানমারসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তীর্থ যাত্রী দের উপস্থিতিতে ঘটে মহা মিলন মেলা। ব্যতিক্রম ধর্মী এ মেলায় রাতের পর রাত গান ও নাটক উপভোগ করেন সকল ধর্মের মানুষ।

স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব রোকন জানান, ‘দেশী-বিদেশী পর্যটকদের মুল আকর্ষণ হচ্ছে মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির’। ‘পর্যটন মৌসুম ছাড়াও এই মন্দির দেখতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক আদিনাথ মন্দিরে আসে’। কিন্তু, ‘যেভাবে এই মন্দিরকে নিয়ে উন্নয়ন হওয়ার কথা, সেভাবে উন্নয়ন হয়নি’। ‘চলতি বছরে এই মন্দিরে সার্কিট ক্যামরা, বিশ্রামাগার সহ সামান্য কিছু উন্নয়ন হয়েছে। তিনি এই আদিনাথ মন্দিরকে কক্সবাজার মেগা প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি জানান।

মহেশখালী আদিনাথ মন্দির সংস্থার কমিটির সভাপতি পূর্নচন্দ্র দে জানান, মহেশখালী আদিনাথ মন্দির বিশ্বখ্যাত। এই মন্দির দেখতে দেশী-বিদেশী পর্যটকরা দুরদুরান্ত থেকে আদিনাথ পাহাড়ে আসেন। কিন্তু, দিন দিন এই মন্দির সুষ্টু পরিকল্পনা ও যথাযত উদ্যোগের অভাবে আকর্ষণ হারাচ্ছে। তাই খুব দ্রুত এই মন্দিরটি সংস্কার করে পর্যটন উন্নয়নে সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

Cox-Adinat Pic-(4)কক্সবাজার জেলা পুজা উদযাপন কমিটি সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা জানান, ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ পাহাড়ের পাদদেশে বসা এই সার্বজনীন বাঙ্গালীর মিলন উৎসব এখন ঐতিহ্য ও প্রাণ চাঞ্চল্য হারাতে বসেছে। এক সময় জারি, সারি, ভাটিয়ালী সহ নানা প্রকার গান, পুঁথিপাঠ ও পালা কীর্ত্তন হতো মেলা চত্বরে। দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন উপভোগ্য অনুষ্ঠানমালার পাশাপাশি দেশের বাইর থেকে আসা নাট্য ও সার্কাস দল রাতের পর রাত মঞ্চায়িত করত ‘বেগম সাহেবা’ ‘রূপবান’ ‘রহিম বাদশা’ ও সুজন সখি’র মতো গ্রাম প্রিয় নাটক আর গ্রামবাংলার মানুষের জনপ্রিয় বিভিন্ন লোকজ সংগীত। তাছাড়া মেলায় পাওয়া নকশা আঁকা রঙ্গিন ঘুড়ির যুদ্ধ এবং অনেক দূর থেকে ভক্তরা আসত ছয় চেঁদা মুরালী নিয়ে। বাঁশের মুরালীর তাল আর সানাই নিয়ে বাজাতে ব্যস্থ থাকত রাখালরা। ইদানিং মেলার সেই জৌলুস এখন আর নেই।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: আলী হোসেন জানান, ‘শুধু আদিনাথ মন্দির কেন, পুরো কক্সবাজারকে পাল্টে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার’। সে লক্ষে কাজ হচ্ছে এবং হবে। সরকার যে কটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেখানে আদিনাথ মন্দিরও সংস্কার হবে। এটিকে আধুনিক মানের পর্যটন স্পট হিসাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক জানান, বর্তমান সরকারের অধিকাংশ উন্নয়ন তো মহেশখালীকে ঘিরে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর, মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আদিনাথ মন্দিরকেও পর্যটনের আওতায় এনে পর্যটন শিল্প বিকাশে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গ, সনাতন সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক তীর্থ ভূমি আদিনাথ মন্দির। খ্রীষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর পূর্বে এ দ্বীপে সনাতন সম্প্রদায়ের স্বয়ং দেবাদি দেব মহা দেব প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালিন জনৈক নেপালি রাজা সাড়ে ৩ হাজার বছর পূর্বে আদিনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে মহেশখালী দ্বীপের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান নুর মোহাম্মদ সিকদার আদিনাথের অস্থিস্ত খুজে পান। প্রতিরাতে ওই মুসলিম পরিবারের একটি দুগ্ধজাত গাভী সেখানে স্বয়ংক্রিয় ভাবে দুধ ঢালতেন। একদিন স্বপ্নপ্রাপ্ত হয়ে ওই মুসলিম পরিবারের সন্তান যেখানে দুধ ঢালতেন সেখানে একটি গৃহ নির্মাণ করে দেন। এরপর থেকেই সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন আবিস্কৃত শিব লিঙ্গ সর্ম্পকে বেত পুরানের বর্ণনা মতে আদিনাথ মন্দির রক্ষানাবেক্ষনের দায়িত্ব পালন করেন। এই খবর তৎকালিন সময়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে মহেশখালী চ্যানেলে তীর ঘেষে ঐতিহাসিক মৈনাক পর্বতের সর্বোচ্চ চুড়াটি হয়ে উঠে সনাতন সম্প্রদায়ের মহা তীর্থ স্থানে। পরবর্তী পর্যায়ে এ তীর্থ স্থান সনাতন সম্প্রদায় ছাড়াও দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় হয়ে উঠে।

প্রাচীনতম আদীনাথ মেলার আকর্ষণ বাড়াতে ও অতীতের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন ও ধর্মীয়স্থান আদিনাথ মন্দির ফিরে পাবে হ্নত গৌরব। এমনটি প্রত্যশা স্থানীয়দের।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like