সার্ফার আলমগীর নিজেই তৈরি করছেন সার্ফিং বোর্ড

পর্যটন ডেস্ক :  একটু আগেই সূর্য ডুবেছে। তবে কক্সবাজার সৈকতে তখনো উজ্জ্বল দিনের আলো। হাওয়া বদলাতে আসা মানুষেরা সূর্যকে বিদায় জানাতে হাজির। তাই সৈকতের লাবণী পয়েেন্ট পা ফেলার জো নেই। এখানেই দেখা হওয়ার কথা

মোহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে। ১৭ জানুয়ারি সকালে যখন কথা হয়, তিনি বলেছেন, ‘আমার ছয়টা পর্যন্ত ডিউটি, এরপর আপনি লাবণীতে আইসা কল দিয়েন।’
আলমগীরের ফোনে কয়েকবার রিং হলো। কিন্তু অপর প্রান্তে কোনো সাড়া নেই। ঘড়িতে ছয়টা পার হয়েছে। মানুষের শোরগোল কমতে শুরু করেছে। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে সুর তুলছে সমুদ্র। তখনই আলমগীরের ফোন, ‘ভাই, আমি তো উইকলি মিটিংয়ে। এই পাশেই অফিস, আপনি একটু আসেন।’
নিজের তৈরি উদ্ধারকারী বোর্ড হাতে মোহাম্মদ আলমগীর। ছবি: সংগৃহীতমোহাম্মদ আলমগীর একজন শৌখিন সার্ফার। তাঁর মতো সৈকতে বড় হওয়া অনেকেই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দেন। তবে আলমগীর সবার নজর কেড়েছেন নিজ হাতে বানানো সার্ফিং বোর্ড নিয়ে। দেশীয় উপকরণ সংগ্রহ করেই তিনি বানিয়েছেন মানসম্পন্ন সার্ফিং ও উদ্ধারকারী বোর্ড। যুক্তরােজ্যর ইংরেজি দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান–এর অনলাইন সংস্করণে তাঁর গল্প পড়েছে দুনিয়ার অনেক মানুষ। সার্ফিং কিংবা কোনো উদ্ধার অভিযানে নিজের তৈরি বোর্ড নিয়েই তিনি নেমে পড়েন সমুদ্রে। তাঁর সাক্ষাৎ পেতেই সেদিন লাবণী পয়েন্টে যাওয়া।
সৈকতের এই স্থানটির কাছেই একটি বিপণিবিতানের কক্ষে সি-সেফের কার্যালয়। খুঁজে নিতে খুব বেশি বেগ পেতে হলো না। আলমগীর পেশায় এই বেসরকারি সংস্থার উদ্ধারকর্মী। সি-সেফের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা দিচ্ছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) নামে আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা। সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সচেতন করা এবং পানিতে ডুবতে বসা পর্যটকদের জীবন রক্ষা করা সি-সেফের উদ্ধারকর্মীদের কাজ। ছোট ঘরের এক দিকে বসার জায়গা, অন্য দিকটায় রাখা তিনটি উদ্ধারকারী বোর্ড। সংস্থাটির কক্সবাজার কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমদ ইশারায় হলুদ একটি
বোর্ড দেখিয়ে বললেন, ‘এটা আলমগীরের বানানো’। এই সি-সেফ কার্যালয়ে বসেই কথা শুরু হয় আলমগীরের সঙ্গে।

আলমগীর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দেন নিজের বানানো সার্ফিং বোর্ডে। ছবি: সংগৃহীতউত্তাল ঢেউয়ের রোমাঞ্চ
২০১১ সালের কথা। সৈকতে তখন ওয়াটার বাইক চালান আলমগীর। বিকেল হলেই এই লাবণী পয়েন্টে আসতেন সার্ফার জাফর আলম। দলবল নিয়ে শুরু করেন সার্ফিং। কাছ থেকে আগ্রহ নিয়ে দেখেন ১৮ বছর বয়সী আলমগীর। ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা, কী রোমাঞ্চকর ব্যাপার! কল্পনায় আচমকা নিজেকেই আবিষ্কার করেন সার্ফিং বোর্ডে। তবে তাঁকে বেশি দিন কল্পনার জগতে থাকতে হলো না। আলমগীর বলেন, ‘ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে একসময় জাফর আলমের দলের সদস্য হয়ে যাই।’
দিন, মাস পেরিয়ে তাঁর জীবনে স্বপ্ন পূরণের ক্ষণ আসে। সার্ফিং বোর্ড নিয়ে ছুটে যান সমুদ্রে। শুরু হয় এক সমুদ্রসন্তানের রোমাঞ্চকর জীবন। আলমগীর বলে যান, ‘সার্ফিং করার অনুভূতি আসলে বলে বোঝানো যাবে না।’
কক্সবাজারের অধিকাংশ সার্ফারের মতোই তাঁর গল্প। জীবনের হয়তো অনেক টানাপোড়েন, কিন্তু সবকিছু সামাল দিয়েও সার্ফিং বোর্ড নিয়ে নেমে পড়েন নোনা জলে। আলমগীর এখন ‘ওয়েভ রাইডার’ নামে একটি সার্ফিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। রোজকার কাজ শেষে নেমে পড়েন সাগরে।

বোর্ড বানাতে ব্যস্ত আলমগীরবোর্ডের নেশায়
সার্ফিংয়ে তো হাতেখড়ি হলো, কিন্তু তাঁর নিজের একটি সার্ফিং বোর্ড নেই। তাই ইচ্ছে হলেই পানিতে নামার উপায় নেই। অবশ্য আর দশজন সার্ফারের অবস্থাও তাঁর মতোই। ব্যয়বহুল সার্ফিং বোর্ড সবার থাকার কথাও নয়। তবু একটি সার্ফিং বোর্ডের আকাঙ্ক্ষা আলমগীরকে পেয়ে বসে। তত দিনে তাঁর সার্ফার-জীবনের তিন বছর। ২০১৪ সালের মে মাসে নিজেই সার্ফিং বোর্ড বানানোর উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু আলমগীর প্রথমে সার্ফিং বোর্ড না বানিয়ে বানালেন রেসকিউ বোর্ড। কেন? আলমগীরের সরল স্বীকারোক্তি, ‘হঠাৎ মনে হলো রেসকিউ বোর্ড যদি সি-সেফকে দিতে পারি, তারা আমাকে সহায়তা করবে।’ এরপরই বোর্ড বানানোর উপকরণ সংগ্রহ করলেন কক্সবাজার শহরের শহীদ মিনার রোডের দোকান আর ঢাকার ফুলবাড়িয়া থেকে। প্লাইউড, ফোম, ফাইবার গ্লাসসহ সব উপকরণ নিয়ে শুরু হলো রেসকিউ বোর্ড বানানোর কাজ। গুনে গুনে ১৮ দিন পর আলোর মুখ দেখল আলমগীরের প্রথম বোর্ড। ইমতিয়াজ আহমদ বলছিলেন, ‘ওর কাজ আমাদের বিস্মিত করেছে। জানতাম এমন কিছু সে করছে, কিন্তু সত্যিই পারবে তা ভাবিনি। যদিও তার বোর্ডে অনেক ঘাটতি ছিল। দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করায় ওজনটাও ছিল বেশি। তবু কোনো রকম প্রকৌশলজ্ঞান ছাড়া একজন মানুষ কীভাবে এটা বানাল!’

সহায় ইচ্ছাশক্তি
কক্সবাজার শহরের ঘোনার পাড়ায় আলমগীরের জন্ম। ফজলুল কাদের ও জাহানারা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। মাছ ব্যবসায়ী বাবার পক্ষে সব সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল ছেড়ে সৈকতে ঝিনুক ফেরির ব্যবসা শুরু করেন আলমগীর। সেটা ২০০৫ সালের কথা। এরপর কয়েকবার পেশা বদলিয়েছেন। ওয়াটার বাইক চালকের সহকারী থেকে ওয়ার্কশপে মোটর গাড়ি, বাইক মেরামত—সব পেশার ছবক নিয়েছেন তাঁর এই জীবনে। বিচিত্র পেশার অভিজ্ঞতা তাঁকে সহায়তা করেছে বোর্ড বানানোর কাজে। আলমগীর ব্যাখ্যা করছিলেন, ‘ওয়াটার বাইকেও অনেক উপকরণ ব্যবহার হয়, যা বোর্ডে দরকার হয়। আবার মোটর ওয়াকর্শপেও অনেক কাজ শিখছি।’
তবে সহায় ছিল, তাঁর অদম্য ইচ্ছা। সৈকতে কোনো বোর্ড ভেঙেছে তো কৌতূহলে সেটা উল্টেপাল্টে দেখেছেন। বোঝার চেষ্টা করেছেন বানানোর জন্য কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন বোর্ড সংযোজনের কাজ যাঁরা করেন, তাঁদের পাশেও দিনের পর দিন বসে শিখেছেন। আর এভাবেই উপকরণের নাম, পরিমাণ, পরিমাপ ও সংযোজনের বিষয়গুলো আয়ত্ত করেছেন।

আলমগীরের বানানো কয়েকটি বোর্ডদেশে বিরল
প্রথম উদ্ধারকারী বোর্ড বানানোর পর তাঁকে প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসে সি-সেফ। স্টুয়ার্ড থমসন সংস্থার একজন বিদেশি কর্মকর্তা এসেছিলেন বাংলাদেশে। আলমগীর বলেন, ‘স্টুয়ার্ডের কাছে আমি কিছুদিন ক্লাস করেছি। সে হাতেকলমেও অনেক কিছু শিখিয়েছে।’ এরপর একে একে পাঁচটি সার্ফিং ও উদ্ধারকারী বোর্ড বানান আলমগীর, যা আগেরগুলোর চেয়ে আরও মানসম্পন্ন। ২০১৫ সালে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা নিজের সার্ফিং বোর্ড নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘ব্র্যাক চিকেন প্রথম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায়’। তখনই সবাই জানল আলমগীরের বিরল উদ্ভাবন সম্পর্কে। ঢাকায় আলমগীরের উদ্ভাবন নিয়ে বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলছিলেন, ‘আলমগীর তো বোর্ড বানানোর কাজটাকে রীতিমতো সাধনা হিসেবে নিয়েছিল। যত দূর জানি, বাংলাদেশে সে-ই প্রথম এমন বোর্ড তৈরি করেছে। আলমগীর আমাদের বিএসএর সিনিয়র সদস্য। তার কাজে আমরা গর্বিত।’
দেশীয় উপকরণে তৈরি বলে আলমগীরের বানানো বোর্ড দামেও সস্তা। ইমতিয়াজ আহমদ বলছিলেন, বিদেশ থেকে একটি রেসকিউ বোর্ড আনতে আমাদের খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। অথচ আলমগীরের বানানো রেসকিউ বোর্ড ১৮ হাজার ও সার্ফিং বোর্ড ১২ হাজার টাকায় তৈরি করতে পারেন। তাঁকে কারিগরি বিষয়ে দক্ষ করতে পারলে আমাদের জন্যই ভালো।’
আলমগীরের জীবন ও স্বপ্নের কথা শুনতে শুনতে চলে আসি সাগরপাড়ে। রাতের সুনসান সৈকতে আলাপ হলো আরও কিছুক্ষণ। চিরচেনা সৈকতে দাঁড়িয়ে আলমগীর বলে যান, ‘আমি বাণিজ্যিকভাবে এগুলো বানাতে চাই। স্বপ্ন দেখি আমার নিজের একটি প্রতিষ্ঠান হবে। যেখান থেকে স্বল্পমূল্যে সার্ফিং বোর্ড নিতে পারবে সার্ফাররা।’

সূত্র : প্রথম আলোর ছুটির দিন।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like