বিজ্ঞানীরা যেভাবে তারার দূরত্ব মাপেন

STAR20170127081128

বিজ্ঞান ডেস্ক : আমরা অনেকেই আমাদের পৃথিবী থেকে চাঁদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্বের কথা জানি। জানি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের পরিমাণ সম্পর্কেও। বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের আশীর্বাদে আকাশের কোন নক্ষত্র কার তুলনায় কত বড় কিংবা কতদূরে অবস্থিত সেসবও জানতে পারছি। কিন্তু এতদূর থেকে পৃথিবীতে বসেই তাদের দূরত্ব মেপে ফেলার কথা শুনলে অনেকেরই বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আবার অনেকের বিজ্ঞানীদের এই তারার দূরত্ব মাপার রহস্য নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। আসলে এই রহস্যের পেছনে কী রয়েছে চলুন জেনে নিই।

রাতের আকাশে খোলা চোখে আমরা যে তারা দেখি সেগুলো দেখে আমরা সবাই সাধারণ একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, এই তারাগুলোর কোনোটি উজ্জ্বল, কোনোটি অনুজ্জ্বল বা কম উজ্জ্বল। অর্থাৎ উজ্জ্বলতা অনুসারে এগুলো সাজানো যায়। এই ঔজ্জ্বল্য প্রসঙ্গ আসলে সবার আগে যার নাম স্মরণ করতে হয় তিনি হলেন জ্যোতির্বিদ হিপ্পারক্যাস।

আজ থেকে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বছর পূর্বে তিনি শুধু আকাশের তারাগুলোকে গুনেই থেমে থাকেননি, উজ্জ্বলতা অনুসারে সাজিয়ে এদের শ্রেণীবিন্যাসও সর্বপ্রথম তিনিই করেছিলেন। প্রথমে তিনি কুঁড়ি বাইশটি নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতম তারা ধরে নিয়ে ‘ফার্স্ট ম্যাগনিচ্যুড স্টার’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এরপর উজ্জ্বলতা অনুসারে সেকেন্ড, থার্ড ইত্যাদি ক্রমে সাজিয়েছিলেন। এই শ্রেণীবিন্যাসে প্রতিটি ম্যাগনিচ্যুডের তারকারা পরের তারকাদের তুলনায় ২.৫ গুণ উজ্জ্বল। তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক টেলিস্কোপের সাহায্যে একটি সর্বশেষ ম্যাগনিচ্যুডের নিস্প্রভপ্রায় তারকাকেও বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।

যা হোক, উজ্জ্বলতা অনুসারে তারকাদের এই শ্রেণীবিন্যাসের মাধ্যমে তারাদেরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ। আর তারই ধারাবাহিকতায় তারাদের দূরত্ব নির্ণয় করার পদ্ধতি বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন।

তবে কিভাবে তারাদের দূরত্ব মাপা হয় সেটা জানার আগে তারাদের দূরত্ব মাপার একক সম্পর্কে একটু জেনে নিলে সমগ্র বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। আমাদের সৌরজগতের বিভিন্ন কিছুর দূরত্ব মাপা হয় সাধারণত অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিট বা ‘এ.ইউ’-তে। যেমন, সূর্য থেকে বৃহস্পতির গড় দূরত্ব ৭৭ কোটি ৮৫ লাখ কোটি কিলোমিটার না বলে এই একক অনুসারে বলা যায় ৫.২ এ.ইউ কিংবা সূর্য থেকে নেপচুনের গড় দূরত্ব ৩০.১ এ.ইউ। কিন্তু সৌরজগৎ ছাড়িয়ে গেলে এই ইউনিটের হিসাব করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আরও বড় একক ব্যবহার করতে হয়। বৃহত্তর এই এককটি হল আলোকবর্ষ বা লাইট ইয়ার। মহাশূন্যে আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লাখ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। আর এমনি করে এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে সেটাই হচ্ছে আলোকবর্ষ। আবার মহাকাশের অধিকাংশ নক্ষত্রের দূরত্ব প্রকাশ করার জন্য এই আলোকবর্ষও যথেষ্ট নয়। তাই আরো বড় একক হিসেবে ব্যবহার করা হয় ‘পারসেক’ এবং ‘মেগা পারসেক’। এক পারসেক হল ৩.২৬১৫৬ আলোকবর্ষ বা ৩১ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। আর এক মিলিয়ন পারসেককে এক মেগা পারসেক (এম.পি.সি) বলে।

ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী হারবারট হল টারনার ১৯১৩ সালে সর্বপ্রথম এই একক ধরে তারাদের দূরত্ব মাপেন। তবে এর আগেও বিভিন্ন একককে কেন্দ্র করে তারাদের দূরত্ব মাপা হতো। তারাদের দূরত্ব প্রথমবারের মতো মাপেন প্রাশিয়ার (বর্তমান জার্মানি) জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেসেল। ১৮৩৮ সালে স্টেলার প্যারালাক্স স্কেলে তিনি এই দূরত্ব মাপা শুরু করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষের দিক পর্যন্ত ত্রিকোণমিতিভিত্তিক এই প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে ঔজ্জ্বল্য ও বর্ণালী বিশ্লেষণ করেই এই দূরত্ব মাপা হয়ে থাকে।

আগেই বলা হয়েছে আমরা রাতের আকাশে বিভিন্ন ঔজ্জ্বল্য তারকা দেখি। মূলত এই ঔজ্জ্বল্য এবং নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসা আলোর বর্ণালীর ওপর ভিত্তি করে তাদের দূরত্ব, আয়তন ইত্যাদি মাপা হয়ে থাকে। ঔজ্জ্বল্যর ওপর নির্ভর করে তারাদের দূরত্ব মাপা যায় যদিও তারাদের আলোর বর্ণালীর বিশ্লেষণ অতীব জরুরি। পৃথিবী থেকে সূর্যকে আমরা চোখ ঝলসানো রূপে দেখতে পাই কিন্তু ঘুটঘুটে রাতের আকাশে মৃগশিরা নক্ষত্রটিকে দেখতে অনেক কষ্ট হয়। আপাতদৃষ্টিতে মৃগশিরা অনুজ্জ্বল হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণায় মৃগশিরা আসলে সূর্য থেকে ৯০০০ গুণ উজ্জ্বলতর। সূর্যের তুলনায় এটি আমাদের থেকে বহুগুণ দূরে বলেই একে এতো নিস্প্রভ দেখায়। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড আর মৃগশিরা থেকে আলো আসতে সময় লাগে ১৮০০ বছর। সুতরাং উজ্জ্বলতার ওপর দূরত্বের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

এবার আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণে আসা যাক। মূলত একটি বস্তু আলো ছড়ায় এবং কতটুকু রঙিন হয়ে ওঠে তা নির্ভর করে সে কতটুকু উত্তাপ সেটির ওপর ভিত্তি করে। আলোর এই বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে তার ভেতরের উত্তপ্ত পদার্থের রাসায়নিক গঠন পাওয়াও সম্ভব। যেমন, একটি লোহার রডকে যদি ক্রমাগত গরম করা হয় দেখা যাবে এটি যত উত্তপ্ত হয় এটি থেকে তত বেশি আভা নির্গত হওয়া শুরু হয়। তাপমান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোহা থেকে যে আভা নির্গত হয় তার রঙও পরিবর্তন হয়- প্রথমে ইটের রঙ থেকে ক্রমে উজ্জ্বল লাল, তারপর গেরুয়া রঙ- এরপর লালসোনালির পর হলুদ রঙের ছোপ পড়তে শুরু করে। হলুদ রঙ উজ্জ্বলতর হতে হতে লোহার রডটা গলতে শুরু হওয়ার আগে নীলাভ সাদা রঙ এর রূপ নেয়। সুতরাং দেখা যায় তাপমাত্রা পরিবর্তন হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে আলোর রঙের পরিবর্তন ঘটে থাকে। সুতরাং বলা যায় রঙের সঙ্গে বস্তুর একটি সম্পর্ক জড়িত।

বিভিন্ন রঙ বৈচিত্র্যের সঙ্গে বস্তুবিশেষের একটি পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে সর্বপ্রথম নথিবদ্ধ করেছিলেন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ফটোবিশেষজ্ঞ থমাস ওয়েজউড। চীনামাটির বস্তুসামগ্রী তৈরি করার সময়ে এটা তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। পরবর্তীতে জার্মান পদার্থবিদ উইলহেম উইন প্রমাণ করে দেখান যে, ‘তাপ বিকিরণের বর্ণ বা রঙ হয় এর তাপমাত্রা অনুসারে অর্থাৎ কোনো বস্তুর তাপমান যত বাড়তে থাকে, বিকিরণের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য তত কমতে থাকে।’ এই সুত্রটিকে ‘উইনস ডিসপ্লেসমেন্ট ল’ বলা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কারের জন্য তাকে ১৯১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এরপর বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা দেখান যে অ্যাবসুলেট জিরো ডিগ্রির ওপরে যেকোনো বস্তুর তাপমাত্রা পৌঁছানো মাত্রই বস্তু বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির আলো ছড়াতে থাকে। অ্যাবসুলেট জিরো ডিগ্রির মান -২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিভিন্ন সময়ে পদার্থবিদ্যার এইসব আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূলত পদার্থের এইসব ধর্ম, তারাদের থেকে বিচ্ছুরিত আলোর বর্ণালী এবং ঔজ্জ্বল্যের ওপর নির্ভর করে আলোর গতির সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে গবেষণার মাধ্যমে কোন তারা কত পারসেক কিংবা মেগা পারসেক দূরে অবস্থিত তা নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে দূরের ধূমকেতু কিংবা নক্ষত্রদের পরিণতি সম্পর্কেও জানা যায়। জানা যায় মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান সম্পর্কেও।

বর্তমানে নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য এবং বর্ণবৈচিত্র্যের ওপরে নির্ভর করে এর তাপমান, রাসায়নিক গঠন, আয়তন এবং দূরত্ব নির্ণয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন নতুন রহস্য বের হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো এমন নতুন নতুন কিছু আবিষ্কৃত হবে যার মাধ্যমে আমরা সহজেই মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরো নতুন কিছু জানতে পারবো।

তথ্য সহায়তা:  * এ কোয়ান্টাম টু কসমোলজি : লি স্মোলিন। * দ্য হিস্টোরিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অব কোয়ান্টাম থিওরি : জগদীশ মেহরা, হেলমুট রিসেনবারগ, ভলিউম ওয়ান। * থমাস ওয়েজউড, এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা। * প্যারালাক্স: অ্যালেন ডব্লিউ হারস্ফিল্ড। * মহাবিশ্বের উৎস সন্ধানে : শঙ্কর মুখোপাধ্যায়। * অ্যালোনস অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল কোয়ান্টিটিস : ফোর্থ এডিশন, অর্থার এন কক্স। * অ্যাস্ট্রোনমি বিফোর টেলিস্কোপ : ক্রিস্টোফার ওয়াকার

সূত্র : রাইজিংবিডি

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like