মহেশখালীর অস্ত্র কারিগররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে

cox-arms-picনিজস্ব প্রতিবেদক, ০৮ জানুয়ারি : র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান ও নানা তৎপরতা স্বত্ত্বেও কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে তৈরী হচ্ছে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। তৈরী হওয়া এসব অস্ত্র গুলোর বাজার মুল্য কম এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের কাছে চাহিদা বেশী থাকায় এক শ্রেণীর অস্ত্রের কারিগররা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরী করছে এই উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে। তৈরী হওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের হাত বদলে আইন শৃংখলা বাহিনীদের ফাঁকি দিয়ে জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থানেও চালান হয়ে যাচ্ছে।

গত বুধবার (৪ জানুয়ারী) এমনই একটি অস্ত্রের কারখানার সন্ধান পায় কক্সবাজারের র‌্যাব-৭এর সদস্যরা। ওই কারখানায় অভিযান চালিয়ে কারখানা থেকে দেশীয় তৈরী ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২২ রাউন্ড গুলি ও ৩৩টি অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এসময় মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের মহিষের ডেইল এলাকার মৃত আজম উল্লাহর আবদুল মাবুদ (৪০) ও একই ইউনিয়নের আহমদিয়া কাটা এলাকার পুত্র কবির আহমদের পুত্র আবু তাহের (৪২) কে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া ২২টি অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১৪টি এক নলা বন্দুক, ৬টি ওয়ান শুটার গান, একটি থ্রী কোয়াটার বন্দুক ও ১টি দেশীয় রাইফেল। ২২ রাউন্ড গুলি ছাড়াও ৩৩ টি সরঞ্জামের মধ্যে ডিল মেশিন, বন্দুল পাইপ, রেত, প্লাস, ব্লেড, এয়ার মেশিন সহ নানা কিছু রয়েছে।

মহেশখালীর পাহাড়ে সংঘবদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কারখানা গড়ে তুলে দেশীয় অস্ত্র তৈরি করার কথা জানিয়ে কক্সবাজারস্থ র‌্যাব-৭ এর কোম্পানী কমান্ডার লে. কমান্ডার আশেকুর রহমান বলেন, র‌্যাবের হাতে আটক আবদুল মাবুদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন পাহাড়ে আস্তানা তৈরী করে ছোট কারখানায় তিনি অস্ত্র তৈরী করছে দীর্ঘদিন ধরে। এসব অস্ত্র রোহিঙ্গা, জলদস্যূ, ডাকাতের কাছে বিক্রি করে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তৎপরতার ভিত্তিতে র‌্যাব অভিযান শুরু করেছে। ইতিমধ্যে অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেকের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। সিন্ডিকেট সদস্যদেরও গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মহেশখালীর পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে বিভিন্ন কারখানায় তৈরী হচ্ছে দেশীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দাগী, সন্ত্রাসী ও দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে বেশী। এ কারনে দৈশীয় তৈরী অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং দাম বেশী পাওয়ায় এখানকার কারিগররা এই অস্ত্র তৈরী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে রাত-দিন পরিশ্রম করে তারা বিভিন্ন রকমের দেশীয় অস্ত্র তৈরী করেই যাচ্ছে। তবে র‌্যাব-পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে কিছু অস্ত্র ধরা পড়লেও অস্ত্র তৈরীর কারিগররা রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে। গত ৩ বছর আগে এসব পাহাড়ে অস্ত্র কারখানায় অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীর গুলিতে পুলিশের এসআই পরেশ কুমার কারবারি নিহত হয়েছেন। এছাড়া অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে খুন হয়েছে আরও অনেকই। গত ২ বছরে শুধু মাত্র কালারমারছড়া ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ১৩ জন। এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালীর বড় ডেইল, ছোট মহেশখালীর মরাঝিরি, কালারমারছড়ার ফকিরজুম পাড়া পাহাড়, সাতঘর পাড়া, শাপলাপুরের মৌলভীকাটা, পাহাড়ী জুমসহ কড়ইবনিয়া, পুটিরঝিরি, সারসিয়া, গুলুরবরঘোনা, বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র তৈরীর কারখানা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ওইসব কারখানায় তৈরী হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র। রাতের বেলায় আইন শৃংখলা বাহিনীর অভিযানের ভয়ে তারা দিনের বেলায় অস্ত্র তৈরী করাকে বেশী নিরাপদ মনে করে। এছাড়া, বিভিন্ন জায়গা তাদের একাধিক সোর্স থাকায় র‌্যাব, পুলিশ আসার আগাম খবর তারা মোবাইলের মাধ্যমে সোর্সের কাছ থেকে পেয়ে সতর্কবস্থায় থাকেন। ফলে রাত্রে ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করে না। গহীন পাহাড়ে খোদাই করে দুই দিকে রাস্তা রেখে মনোরম পরিবেশে তারা ওয়ার্কসপের মত করে এ অস্ত্র তৈরীর কারখানা গুলো তৈরী করে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার লোহার পাট, স্টীলের নল, ড্রিল মেশিন, গ্যাসের চুলা, কয়লা, লেইদ মেশিনসহ বিভিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরীর যন্ত্রপাতি। একটি অস্ত্র তৈরী করতে ২/৩ হাজার টাকা খরচ হলেও সেটি স্থানীয়ভাবে ৪/৫ হাজার টাকায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭/৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর এসব কারখানায় নিয়মিত আসা-যাওয়া রয়েছে কালারমারছড়া উত্তর নলবিলা এলাকার দাগী সন্ত্রাসী ও একাধিক মামলার ফেরারী আসামীদের। তাদের রয়েছে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। ওই নেটওয়ার্ক ফিশিং ট্রলার, লবণ বোঝাই গাড়ীর পলিথিনের মাধ্যমে তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র সরবরাহ ও বিক্রি করে।

মহেশখালী থানায় যোগদান করার পর এ পর্যন্ত ৩৮টি অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়ে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল বনিক বলেন, পাহাড়ী অরণ্যে অস্ত্রের কারখানার কথা শুনা যায়। তবে কতটি অস্ত্রের কারখানা রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় পুলিশ অভিযানে যাওয়ার আগেই অস্ত্র ব্যবসায়ী ও কারিগররা নিরাপদে সরে পড়েন। তবে গত ১০ মাসে এসব অপরাধিদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়েছি এবং গ্রেপ্তারও হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like