তিন দুর্ধর্ষ জঙ্গি ধরতে গোয়েন্দারা মরিয়া

untitled-1_261338জাতীয় ডেস্ক : মারজান নিহত হওয়ার পর এখনও সক্রিয় এমন আরও তিন দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে ধরার তৎপরতা জোরদার করেছেন গোয়েন্দারা। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সমন্বয়ক ও সামরিক কমান্ডার চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, নব্য জেএমবির অন্যতম সংগঠক মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা ও বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেটকে গ্রেফতারে চলছে বিভিন্ন ইউনিটের টানা অভিযান। জঙ্গি দমনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, কঠোর অভিযানের কারণে ওই শীর্ষ তিন জঙ্গি তাদের নাশকতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারলেও সংগঠনের জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহ ও তাদের ‘মগজ ধোলাইয়ে’ কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এসব ঠেকাতে ওই তিনজনকে যত শিগগির সম্ভব গ্রেফতারে জোর তৎপরতা চলছে। এ ছাড়া চিহ্নিত আরও অন্তত ১০ জঙ্গিও গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে। তাদেরও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পলাতক শীর্ষ তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার অভিযানের বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল শনিবার সমকালকে বলেন, পৃথক দুটি সংগঠনের ওই তিন শীর্ষ জঙ্গিকে আইনের আওতায় আনা গেলে দেশে জঙ্গি কার্যক্রমের বিষয়ে আরও তথ্য মিলবে। সংগঠন দুটির ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরাও সহজ হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নব্য জেএমবি এবং এবিটির কার্যক্রম ভিন্ন। এবিটি নেতা মেজর জিয়া দেশে ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষ হত্যার অন্যতম হোতা। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া এবিটির জঙ্গিদের ভাষ্যে তার নাম বেরিয়ে এসেছে। অপর দিকে আবু মুসা ও বাসারুজ্জামান নব্য জেএমবির মূলহোতা নিহত জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরীর আস্থাভাজন। নব্য জেএমবির টার্গেট মাজারপন্থি, শিয়া সম্প্রদায় ও বিদেশি নাগরিকরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত শুক্রবার জঙ্গি দমন বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, দেশে পালিয়ে থাকার মতো কোনো জায়গা জঙ্গিদের আর থাকবে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মুসাসহ যেসব জঙ্গি পলাতক রয়েছে শিগগিরই তারা ধরা পড়বে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনার শেষে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, গুলশান হামলার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশ জঙ্গিই নিহত হয়েছে। পলাতক জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্রমেই তা জোরদার করা হবে।

ছদ্মবেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে জিয়া: সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া এবিটির অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী ও সামরিক প্রধান। পলাতক এই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ সদর দপ্তর গত ২ আগস্ট ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। জঙ্গি দমনে নিয়োজিত কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, জিয়া দেশেই আত্মগোপনে রয়েছে বলে তাদের ধারণা।

গতকাল দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া এবিটির জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য অনুযায়ী জিয়া দেশেই আত্মগোপনে আছে। তাকে গ্রেফতারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে, যা অব্যাহত রয়েছে।

বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেওয়া ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তারা ধারণা করছেন, জিয়ার মুখে একসময় দাড়ি থাকলেও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে সে দাড়ি কেটে ফেলেছে। নানা ছদ্মবেশে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে গ্রেফতারে সব চেষ্টাই অব্যাহত আছে।

ঘন ঘন আস্তানা বদলাচ্ছে মুসা: পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পলাতক মইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসাই এখন নব্য জেএমবিকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নব্য জেএমবির অপারেশনাল কমান্ডার মারজান নিহত হওয়ার পর এখন সবকিছুই চলছে তাকে ঘিরে। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই অভিযানে নিহত হওয়ার পর মুসা অন্যতম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, গত ২৩ ডিসেম্বর আশকোনায় মুসার আস্তানায় অভিযান চালালেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ওই সময় তার স্ত্রী তৃষামনি ওরফে উম্মে আয়েশা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তৃষাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মুসার জঙ্গি জীবনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপরই সাভার ও গাজীপুরে সম্ভাব্য কয়েকটি আস্তানা চিহ্নিত করে মুসাকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হয়। এ ছাড়া রাজধানীর অন্তত দুটি বাসায় চলে অভিযান। তবে দুর্ধর্ষ ওই জঙ্গি ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় তাকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি।

সূত্র জানায়, মুসা মূলত ফয়সাল নামের এক প্রবাসীর মাধ্যমে নব্য জেএমবিতে যুক্ত হয়। ফয়সাল এক রহস্যময় ব্যক্তি। গুলশান হামলার আগে তার ব্রুনাই চলে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া ফয়সালের সঙ্গে জঙ্গি সাগরের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মুসার অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তদন্তও চলছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, মুসা যাতে জঙ্গিদের সংগঠিত করতে না পারে সে জন্যই দ্রুত তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

বাসারুজ্জামান থেকে ‘চকলেট’: কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সূত্র জানায়, মারজান জীবিত থাকার সময়ে তার নির্দেশেই দায়িত্ব পালন করত কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেট। সংগঠনে নানা যোগাযোগ তদারকের পাশাপাশি গুলশান হামলার আগে নব্য জেএমবির কাছে বিদেশ থেকে আসা টাকা গ্রহণ ও বণ্টন করেছিল সে। অস্ত্র সংগ্রহেও ছিল তার ভূমিকা। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, মারজান নিহত হওয়ায় চকলেটকে এসব দায়িত্ব এখন একাই পালন করতে হবে। এজন্যই তাকে দ্রুত আইনের আওতায় নিতে মরিয়া গোয়েন্দারা।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, স্ত্রী ফেরদৌসী আফরিনকে নিয়ে বাসারুজ্জামান আমেরিকায় রয়েছে বলে স্বজনরা জানলেও গত সেপ্টেম্বরে আজিমপুরের আস্তানা থেকে তার স্ত্রীকে গ্রেফতারের পরই বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। জানা যায়, ওই দম্পতি দেশে থেকেই জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন জঙ্গিদের মগজ ধোলাইয়ের কাজ করছে সে। পাশাপাশি সংগঠনের আইটি বিষয়ক কাজগুলোও তদারক করে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, চকলেট এক সময় সংগঠনের অপর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও স্ত্রী গ্রেফতার হওয়ার পর তার বিষয়ে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সে আত্মগোপনে রয়েছে। অবশ্য গ্রেফতার হওয়া স্ত্রীর দেওয়া তথ্য নিয়ে ঢাকার কলাবাগানের একটি বাসা ছাড়াও কয়েকটি আস্তানায় চকলেটকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্র জানায়, আফরিনকে রিমান্ডে নিয়ে তার স্বামীর জঙ্গি কর্মকাণ্ডের নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব তথ্য যাচাই করে চকলেটকে গ্রেফতারে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে।

আরও ১০ জঙ্গিকে খুঁজছে পুলিশ: পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আরও অন্তত ১০ জঙ্গিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এসব জঙ্গির নাম বিভিন্ন ঘটনা তদন্তে বেরিয়ে আসে। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী ওরফে শুভাষ, রাশেদ ওরফে র‌্যাশ, ইকবাল, রিপন, খালিদ, মানিক, মামুন, জুনায়েদ খান, আজাদুল কবিরাজ ও বাদল অন্যতম। তবে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে খালিদ, রিপন ও জুনায়েদ বিদেশে পালিয়ে গেছে।

-দৈনিক সমকাল।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like