নতুন রোহিঙ্গা বস্তির সম্র্রাট নুরুল আবছার

nurul-picনিজস্ব প্রতিবেদক, ০৭ জানুয়ারি : উখিয়ায় বনভূমি দখল করে তৈরী হয়েছে আরো একটি রোহিঙ্গা বস্তি। আর রোহিঙ্গার এ নতুন বস্তির সম্রাট নুরুল আবছার। শুরুতেই মাসিক এক লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের মাধ্যম নিশ্চিত করে স্থাপন করা হয়েছে এ বস্তিটি।

যদিও নতুন বস্তির সম্রাট খ্যাত পালংখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও উখিয়া উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছারের দাবি তিনি রোহিঙ্গাদের কষ্ঠের কথা বিবেচনা করে বস্তিটি তৈরী করতে সহায়তা করেছেন।

উখিয়া বনবিভাগের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দফায় উচ্ছেদের পরও ঠেকানো যায়নি উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালীর নাইন্ন্যার ঘোনা পাহাড়ী এলাকা সামাজিক ও সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নতুন এ বস্তিটি। বন বিভাগের বাধার মুখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নুরুল আবছার এ বস্তি গড়ে তুলেছে। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিশাল অংকের মাসোহারা আদায়ের লক্ষ্যেই এ বসতি গড়ে তুলেছে ওই জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি চক্রটি।

ukhiya-picস্থানীয় লোকজন জানান, বালুখালীর পাহাড়ী এলাকায় বনভূমির গাছ কেটে খুঁটি, বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসবাসের অন্তত ৪ শতাধিক ঝুঁপড়ি ঘর। পার্শ্ববতী কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প থেকে এসে অন্তত ৭ হাজারেরও বেশী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। নতুন করে চলছে আরো ঝুঁপড়ি নির্মাণ। যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে প্রভাবশালী একটি চক্র পরিবার প্রতি আদায় করেছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। সেই সাথে এসব পরিবারকে ভাড়া দিতে হবে মাসে ৩০০ টাকা। বসতি স্থাপনকারী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য জানা গেছে। এ হিসেব মতে, আর আশ্রয় নেয়া ৪ শতাধিক পরিবার থেকে মাসিক এক লাখ ২০ হাজারের বেশি টাকা আদায় হবে।

বালুখালীতে গড়ে উঠা নতুন বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু থানার কুমিরখালী এলাকার আনোয়ারা বেগম (২০)।

তিনি জানান, গত মাসখানেক আগে স্বামী শাহাব উদ্দিনকে মিয়ানমারের সেনারা ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোন খোঁজ-খবর নেই। পরে সুযোগ বুঝে ৭ মাসের শিশু সন্তান সহ মামার সঙ্গে পালিয়ে এসে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের পাশে গড়ে উঠা এক ঝুঁপড়িতে আশ্রয় নিই। গত বুধবার ওখান থেকে বালুখালীর এ বস্তিতে চলে আসেন। স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে আড়াই হাজার টাকার দেয়ার পর ওখানে আশ্রয় পেয়েছে। এরপরও মাসে দিতে হবে ৩ শত টাকা করে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু সীমান্ত পার হয়ে গত সোমবার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, মিয়ানমারের মংডু থানার নাইচাপ্রু এলাকা থেকে ৪ শিশু সন্তানসহ পালিয়ে আসা লায়লা বেগম (৩২)।

তিনি জানান, এপারে আসার পর হাতে যে’কটি টাকা ছিল তা দিয়ে কুতুপালং অনিবন্ধিত বস্তির পাশে পাহাড়ী এলাকায় একটি ঝুঁপড়ি ঘর নির্মাণ করেছিলাম। কিন্তু গত বুধবার বন বিভাগের কর্মীরা অভিযান চালিয়ে তা উচ্ছেদ করেছেন। পরে বালুখালী এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আবছারের সহযোগিতায় এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু হাতে কোন টাকা না থাকায় নতুন করে নির্মাণ করা ঝুঁপড়িতে আশ্রয় নিতে পারছি না। তবে মাসে ৩ শত টাকা দিতে হবে বলে তারা জানিয়েছেন।

ইতিমধ্যে বালুখালীর পাহাড়ী এলাকায় গড়ে উঠা নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে ক্লক ভাগ করে মাঝিও নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ নম্বর ব্লকের স্ব-ঘোষিত মাঝি (সর্দার) করম আলী ও ৪ ব্লকের মাঝি খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানায়, বালুখালীর স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আবছার শুক্রবার সকালে এসে নতুন বস্তিতে গড়ে উঠা বসতিগুলোকে ৭ টি ব্লকে ভাগ করে দিয়ে ৭ জন মাঝি মনোনীত করে দিয়েছেন। এসব ব্লকের বাসিন্দাদের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন এ ৭ জন মাঝিকে।

তবে জোর পূর্বক টাকা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, নতুন করে ঝুঁপড়ি নির্মাণ করে দিতে আশ্রয় নেওয়াদের কাছ থেকে কিছু পরিমান টাকা নেয়া হচ্ছে।

বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, বালুখালীর পাহাড়ী এলাকার বনভূমি দখল করে গত কিছুদিন আগে স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আবছারের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের নতুন একটি বস্তি গড়ে তোলার খবরে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয়। তারপরও সংঘবদ্ধ একটি চক্র সেখানে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বসতি গড়ে তুলতে নানাভাবে ইন্ধন যোগাচ্ছে বলে খবর রয়েছে। কিন্তু বন বিভাগের অভিযানের মুখেও বালুখালীর পাহাড়ী এলাকা নাইন্ন্যার ঘোনায় গত বুধবার থেকে নতুন একটি রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।

এব্যাপারে টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে পালংখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল আবছার বলেন, কুতুপালংয়ে গড়ে উঠা অনিবন্ধিত বস্তি আশপাশের পাহাড়ী এলাকায় রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিতে পারলেও এখানে থাকতে অসুবিধা কোথায় ? মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার এলাকায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে সহায়তা করেছি মাত্র।

নতুন করে বস্তি গড়ে উঠায় আবারো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশংকা করেছেন পালংখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপ সদস্য মো. গফুরুল্লাহ।

তিনি বলেন, “ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা জরুরী ছিল। কিন্তু প্রশাসন সেই ব্যবস্থা না নেওয়ায় রোহিঙ্গা সীমান্ত সংলগ্ন আশপাশের বনভূমিসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। দিন দিন তা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে নতুন করে আরো বেশী রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। ”

উখিয়ার ঘাট বন বিট কর্মকর্তা মোঃ মোবারক আলী বলেন, গত ২০১২-১৩ থেকে ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে গড়ে উঠা আড়াই শতাধিক একর রক্ষিত বনভূমির সামাজিক বনায়ন জবর দখল করে রোহিঙ্গাদের বস্তি নির্মান করা হচ্ছে। এতে বন কর্মীরা উচ্ছেদও অভিযান চালিয়েও রোহিঙ্গাদের বস্তি নির্মাণ থামানো যাচ্ছে না।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যারা পুণর্বাসন করছে প্রশাসন ইচ্ছে করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যথায় প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশংকা দেখা দিয়েছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like