চকরিয়ায় বনভূমি দখল করে অবৈধ বসতি নির্মাণের হিড়িক

chakaria-pictuer-11-12-16

এম মনছুর আলম, চকরিয়া, ১২ ডিসেম্বর: চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে সামাজিক বনায়নের আওতায় উটলগ বাগানের রকমারি গাছ কেটে জায়গা দখলে নিয়ে সেখানে অবৈধভাবে বসতি নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের লোকজন ইতোমধ্যে ১১টি ভুমিহীন পরিবারের বনায়ন দখলে নিয়ে গাছ কেটে সাবাড় করেছে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করে বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন উপকারভোগী ১১টি পরিবার। উল্টো উপকারভোগী পরিবার গুলোকে দখল উচ্ছেদ করার জন্যই প্রভাবশালীরা পাল্টা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম দক্ষিন বনবিভাগের চুনতী রেঞ্জের অধীন চকরিয়া উপজেলার বরইতলী বনবিটের পক্ষ থেকে সামাজিক বনায়নের আওতায় বরইতলী মৌজার ১৪৬৩৯ ও ১৫০৩৮ নম্বর বিএস দাগের উল্লেখিত জায়গা প্লট আকারে বরাদ্ধ দেয়া হয়। ভুমিহীন মৃত গোলাম কাদেরের ছেলে আহমদ হোসেন, মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে আবদুল খালেক, মৃত মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে আবদুল হাকিম, মৃত ওসমান গনীর ছেলে হামিদুল ইসলাম, আজিজুর রহমানের ছেলে জসীম উদ্দিন, মৃত আবদুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ, মৃত কবির আহমদের ছেলে সরফুদ্দিন, লাল মিয়ার ছেলে মোজাফফ্র আহমদ, জ্যো¯œাময় দে’র ছেলে জগদিস দে, মৃত দেবেন্দ্র ঘোষের ছেলে ঝুনু কুমার ঘোষ ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ’র স্ত্রী রওশন আক্তারকে ৩৫ হেক্টর উটলগ বাগান ১১টি পরিবারকে অংশিদারের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচিত করা হয়।
ভুক্তভোগী উপকারভোগীরা জানান, বনায়ন সৃজনের পর অক্লান্ত পরিশ্রম ও রক্ষনাবেক্ষনের কারনে প্রায় ৫বছরের ব্যবধানে প্রতিটি প্লটে গাছ গুলো অনেক বড় হয়েছে। ইতোমধ্যে বাগানের গাছ গুলো বড় হতে দেখে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র তাদের বনায়নের ওই জায়গা জবরদখলের জন্য নানাভাবে তোড়জোড় চালাতে চেষ্টা করে। তাঁরা বারবার বাঁধা দিয়ে বনায়নের গাছ ও জায়গা রক্ষা করে আসলেও সর্বশেষ চলতিবছরের ৩১ অক্টোবর দুপুরে অভিযুক্ত প্রভাবশালী চক্রটি ভাড়াটে লোকজন জড়ো করে উপকারভোগীদের বনায়নে হানা দেয়। এসময় তাঁরা একে একে সব কটি বনায়নের সৃজিত হাজার হাজার রকমারি গাছ কেটে লুটে নেয়ার পর জায়গা গুলো জবরদখলে নিয়েছে। বর্তমানে দখলে নেয়া ওই জায়গা অভিযুক্ত প্রভাবশালী চক্রটি প্লট আকারে বিক্রি করছে, আর তাতে রাতারাতি তৈরী করা হচ্ছে নতুন নতুন অবৈধ বসতি।
উটলগ বনায়নের গাছ কেটে লুট ও বাগানের জায়গা দখলের এ ঘটনায় গত ২ নভেম্বর চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে দুটি নালিশী মামলা দায়ের করেছেন বনায়নের উপকারভোগী বরইতলী ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামের মৃত কবির আহমদের ছেলে সরফুদ্দিন ও বরইতলী হিন্দুপাড়া গ্রামের জ্যো¯œাময় দে’র ছেলে জগদীশ দে। দুটি মামলায় গাছ কাটা ও জায়গা দখলের ঘটনার সাথে অভিযুক্ত করা হয়েছে সাতজনকে। তাঁরা হলেন বরইতলী ইউনিয়নের একতাবাজারস্থ খয়রাতীপাড়ার মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে মোবাশে^র আহমদ, আহমদ হোসেন চৌকিদারের ছেলে নুরুল হক ছুট্টো, আকবর আহমদের ছেলে শিবির নেতা হাফেজ আবদুল করিম, আলী হোসেনের ছেলে শিবির নেতা হাফেজ নুর আহমদ, এরশাদ উল্লাহ’র ছেলে আহসান উল্লাহ, মোজাহেরপাড়া গ্রামের মোবারক আলীর ছেলে শিবির নেতা হাফেজ মিজানুর রহমান, মাইজপাড়া গ্রামের আবুল হাশের ছেলে আমজাদ হোসেন বাবুল।
মামলার আর্জিতে দুই বাদি দাবি করেন, অভিযুক্তরা বনায়নের জায়গা দখলের জন্য গাছ কেটে লুট করে। পরে জায়গা দখলে নেয়। এতে উপকারভোগী ১১টি ভুমিহীন পরিবারের প্রায় ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে। বাদির অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালতের বিচারক এব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চকরিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার বাদি সরফুদ্দিন ও জগদীশ দে জানান, আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলা দুটি তদন্ত করছেন হারবাং পুলিশ ফাড়ির আইসি এসআই আলমগীর আলম।
বনায়নের অংশিদার ক্ষতিগ্রস্থ ১১টি উপকারভোগী পরিবারের পক্ষে সরফুদ্দিন ও জগদীশ দে চকরিয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের জানান, মামলায় যাদেরকে আসামি করা হয়েছে মুলত বনায়নের গাছ কেটে লুট ও বাগানের জায়গা দখলের সাথে তাঁরা সরাসরি জড়িত। তাদেরকে সহযোগিতা করছে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা নজরুল ইসলাম। এ কারনে তাঁরা বারবার দখল চেষ্টার বিরুদ্ধে বাঁধা দিতে গেলে ওই আওয়ামীলীগ নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে অভিযুক্তরা তাদেরকে (উপকারভোগী) নানা ধরণের হুমকি দিচ্ছে। এমনকি আদালতে মামলা দায়ের করায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাদেরকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন সরফুদ্দিন ও জগদীশ দে।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, বনবিভাগের উটলগ বাগান দখল করে গাছ কেটে লুটে নেয়ার পর ঘটনাটি স্থানীয় বরইতলী বনবিটের সংশ্লিষ্টদেরকে জানানো হলেও অদৃশ্য কারনে তাঁরা কোন ধরণের আইনী ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী উপকারভোগীরা। তাঁরা বলেন, বনবিভাগ আমাদেরকে সামাজিক বনায়নের আওতায় উটলগ বাগানের অংশিদার বানিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে ঠেলে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দখলবাজ চক্রের সংশ্লিষ্টদের সাথে বনকর্মীদের যোগসাজস রয়েছে। এ কারনে বনবিভাগ বিষয়টি নিয়ে কুম্ভকর্ণের ভুমিকা পালন করছে।
মামলার বাদি বনায়নের অংশিদার সরফুদ্দিন ও জগদীশ দে অভিযোগ করে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সরকারিভাবে প্রাপ্ত বনায়নের জায়গা উদ্ধারে আদালতের সহায়তা চেয়ে মামলার আশ্রয় নেয়ায় এখন অভিযুক্ত প্রভাবশালী চক্রটি ক্ষিপ্ত হয়েছে। তাঁরা ইতোমধ্যে বনায়নের অপর অংশিদার মৃত ওসমান গনীর ছেলে হামিদুল ইসলাম ও মোজাফ্ফর আহমদের স্ত্রী জয়নাব বেগমকে বাদি করে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে পাল্টা মামলা করেছে। মুলত বনায়ন থেকে উচ্ছেদের জন্য এবং আমাদেরকে হয়রানী করতে তাঁরা পরিকল্পিতভাবে এ মামলা করেছে।
বনায়নের অংশিদার অনেকের দাবি, শুধুমাত্র ১১টি পরিবারের নয়, অভিযুক্ত প্রভাবশালীরা গত কয়েকবছরে বরইতলী বনবিটের অন্তত শতাধিক উপকারভোগী পরিবারের বনায়নের গাছ কেটে লুটের পর জায়গা দখলে নিয়েছে। পরে এসব জায়গা প্লট আকারে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যাঁরা প্রতিবাদ করেছে কিংবা বাঁধা দিয়েছে তাদেরকে বনাঞ্চলের ভেতর ধরে নিয়ে অমানবিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। পিটিয়ে সর্বশরীর থেঁতলে দেয়া হয়েছে। বলতে গেলে বরইতলী ইউনিয়নের বেশির ভাগ জনসাধারণ কোন না কোন ভাবে তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে তার সত্যতা পাবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিন বনবিভাগের ডিএফও রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বনায়নের জায়গা আমার, ক্ষতিগ্রস্থ অভিযোগকারীদেরকে বনায়নের অংশিদার করা হয়েছে মাত্র। সেখানে বনায়নের কোন সমস্যা হলে আগে আমাকে বা আমার অধীনস্থ কর্মকর্তাদেরকে জানানো দরকার। কিন্তু তাঁরা সেটি না করে আদালতে যাবে কেন। তিনি বলেন, তারপরও বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অপরদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, বনায়নের যেই জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে ওই জায়গা সমুহ আগে আসামি পক্ষের লোকজনের দখলে ছিল। পরে অভিযোগকারীরা বনায়নের অংশিদার হয়েছে সেই জায়গায়। তিনি বলেন, বনবিভাগ গাছ রোপন করে দিলেও উপকারভোগীদের অচেতনতার কারনে এখন সেখানে কোন ধরণের গাছ নেই। তারপরও ঘটনাটি ব্যাপার নিয়ে দুই পক্ষ আমার কাছে এসেছিল। আমি তাদেরকে মিলমিশ করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অভিযোগকারীরা তা অমান্য করেছে। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে আমি আর কোন কথা বলিনি, যেহেতু দুই পক্ষের লোকজন সবাই আমার এলাকার বাসিন্দা।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like