প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি

সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই সরকারকে এই ঋণ বহন করতে হচ্ছে। গুনতে হচ্ছে সুদ।

সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। অগাস্ট মাসে বিক্রি হয়েছিল আরও বেশি ৬ হাজার ৩২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

সেপ্টেম্বর মাসে বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। আর অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার হাজার ৯৩২ কোটি টাকার।

এ হিসাবে প্রতিদিন এখন গড়ে ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রির চাপ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কিনলে এক মাস পর ‘বই’ বা এ সংক্রান্ত ‘কাগজ (প্রমাণপত্র)’ দিচ্ছেন কর্মকর্তারা।

আগে সকালে কিনলে বিকেলেই অথবা দু-একদিন পরেই বই বা প্রমাণপত্র দেওয়া হত।

অর্থনীতির একজন গবেষক বলছেন, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ক্রমাগত কমতে থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন‌্য সঞ্চয়পত্র ছাড়া আর কোনো লাভজনক বিকল্প পাচ্ছে না।

“ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা, বাড়ছে সুদ…এতে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে,” বলেন বিআইডিএস এর গবেষক জায়েদ বখত।

তার মতে, এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাজেট ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি: জুলাই-অক্টোবর, ২০১৬-১৭

# সব মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র।

# বিভিন্ন সময়ে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ শোধ করা হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা।

# এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

# এই অংক বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮২ শতাংশ।

# ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ‘ধার’ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

তথ‌্য: জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল শোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিক্রি।

ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। সেজন‌্য সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ের তুলনায় এবার সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম চারমাসে অর্থাৎ জুলাই-অক্টোবর সময়ে ৯ হাজার ৩৩ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল।

জায়েদ বখত বলেন, “ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদ হার কমায় মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকেছে…। তুলনামূলক বেশি সুদ হওয়ায় যার যা সঞ্চয় আছে, তা দিয়ে তারা এখন সঞ্চয়পত্র কিনছে।”

বিনিয়োগে মন্দার কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাংকগুলোতে বিপুল অংকের অর্থ পড়ে আছে, যাকে ‘অলস অর্থ’ বলা হচ্ছে। এই অলস অর্থের কারণে আমানতের সুদ হার কমিয়েই চলেছে ব্যাংকগুলো।

স্থায়ী আমানতের বিপরীতে বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে, যা সঞ্চয়পত্রের সুদের তুলনায় অনেক কম।

২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ গড়ে ২ শতাংশ হারে কমানোর পরও ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায়।

জায়েদ বখত মনে করছেন, সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল ঋণের চাপে সরকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, তা এড়ানোর পথ ‘একটাই’।

“সুদের হার কমাতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ‘পেনশন’ এবং মহিলাদের জন্য ‘পরিবার’ সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার দ্রুত কমাতে হবে,” বলেন তিনি।

অবশ‌্য গত অর্থবছরে সুদ হার কমিয়েও বিক্রির প্রবণতা সরকার কমাতে পারেনি।

আগে পাঁচ বছর মেয়াদি এক লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনলে মাসে এক হাজার ৭০ টাকা মুনাফা পাওয়া যেত। ২০১৫ সালের মে মাসে সুদ হার কমানোর পর পাওয়া যাচ্ছে ৯১২ টাকা। তারপরও সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ এ খাতে বিনিয়োগ কমেনি; উল্টো বাড়ছে।

গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। সুদের হার কমানোর পরও বিক্রি না কমায় সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। অর্থবছর শেষে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ধার করেছিল।

রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কার্যালয়ের নিচ তলায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়।

গত বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে বেশ ভিড় দেখা যায় এবং তার বেশিরভাগেই নারী।

কেউ সঞ্চয়পত্রের বই জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে মুনাফার জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ নতুন সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আরেক লাইনে পূরণ করা ফরম জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে টাকার জমা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন অনেকেই।

এদেরই একজন তহমিনা ইয়াছমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টাকা জমা দিয়েছি…। রিসিট দিয়েছে। একমাস পরে এসে বই নিয়ে যেতে বলেছে।”

এত পরে কেন বই দেওয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে। বই রেডি করতে অনেক সময় লাগে।”

তবে যে তারিখে টাকা জমা দেওয়া হবে সেই তারিখের হিসাবেই মুনাফা দেওয়া হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

আগে সঞ্চয়পত্র কিনলে শুধু বই দেওয়া হত। এখন অনলাইন ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

যাদের যে কোনো ব্যাংকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে ফরম পূরণ করার সময় সেই ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য দিলে প্রতি মাসে সেই অ্যাকাউন্টে মুনাফার অর্থ চলে যাবে। গ্রাহক ইচ্ছেমতো যখন-তখন মুনাফার অর্থ তুলতে পারবেন।

যারা অনলাইন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্র কেনেন তাদের কোন ‘বই’ দেওয়া হয় না। প্রমাণপত্র হিসেবে শুধু একটি কাগজ দেওয়া হয়।

পরিবার সঞ্চয়পত্র

>> পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র; মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়।

>> সঞ্চয়পত্রটি বিক্রি হয় ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৫০ হাজার, ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের।

>> ২০০৯ সালে চালু হওয়া এ সঞ্চয়পত্র থেকে মাসিক মুনাফা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক নামে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা যায়।

>> তবে সবাই এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। কেবল ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী, শারীরিক প্রতিবন্ধী যে কোনো বয়সী নারী-পুরুষ এবং ৬৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নারী ও পুরুষরা এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

পেনশনার সঞ্চয়পত্র

>> পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

>> এই শ্রেণিতে ৫০ হাজার, ১ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের পাঁচ ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে।

>> ২০০৪ সালে চালু হওয়া এ সঞ্চয়পত্র থেকে তিন মাস পরপরও মুনাফা তোলা যায়।

>> অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং মৃত চাকরিজীবীর পারিবারিক পেনশন সুবিধাভোগী স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরাই শুধু এ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র

>> পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র; মুনাফার হার মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

>> এটি দেশের সবচেয়ে পুরোনো সঞ্চয়পত্র, চালু হয় ১৯৭৭ সালে। দেশের যে কোনো নাগরিক এটা কিনতে পারেন।

>> বাজারে ১০, ৫০, ১০০ ও ৫০০ টাকা; ১০০০, ৫০০০, ১০০০০, ২৫০০০ ও ৫০০০০ টাকা এবং ১ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানের বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায়।

>> ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে ৩০ লাখ ও যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো সীমা নির্ধারিত নেই।

মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র

>> তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ।

>> চালু হয় ১৯৯৮ সালে। পাওয়া যায় ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা মূল্যমানে। বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মতো এটিও সবাই কিনতে পারেন।

>> এই সঞ্চয়পত্র একক নামে ৩০ লাখ টাকা ও যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনা যায়।

ডাকঘর সঞ্চয়পত্র

>> তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

>> ডাকঘর থেকে এ সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়ন করা যায়। যে কেউ এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন।

জরুরি প্রয়োজনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও ভাঙানো যায় এসব সঞ্চয়পত্র। সে ক্ষেত্রে মুনাফার হার কিছুটা কম হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে সব সঞ্চয়পত্র কেনা ও নগদায়ন করা যায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like