শেষ রক্ষা হলো না সরকার দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির

mp-bodi-02

বিশেষ প্রতিবেদক, ০৩ নভেম্বর: শেষ রক্ষা হলো না কক্সবাজার ৪ আসনের সরকার দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদির। কখনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ইয়াবার তালিকায়, আবার কখনো মানবপাচারকারি তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে দেশব্যাপী আলোচিত ছিলেন সরকারদলীয় এ সংসদ সদস্য। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোকজনকে মারধরের কারণেও আলোচিত তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত দুদকের দায়ের করা মামলায় বুধবার কারাগারে গেলেন তিনি।

অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের দায়ে কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে ৩ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আবু আহমদ জমাদারের আদালত।

২০১৪ সালের ২১ আগস্ট এমপি আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক আবদুস সোবহান। ২০০৮ ও ২০১৩ সালে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে সম্পদের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এই মামলা দায়ের করেন তিনি। বিতর্কিত সাংসদ বদির বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতি মামলার রায়ে বুধবার বেলা সোয়া এগারটায় এ সাজা দেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আবু আহমেদ জমাদারের আদালত। আদালতে হাজির ছিলেন বদি। রায়ের পর পরই সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। এই রায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এমন দাবী স্থানিয়দের ।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তার হলফনামার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আব্দুর রহমান বদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৯ টাকা মূল্যমানের সম্পদ গোপন করে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বৈধতা দেখানোর জন্য কম মূল্যের সম্পদ ক্রয় দেখিয়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩ হাজার ৩৭৫ টাকা বেশি মূল্যে বিক্রি দেখানোর অভিযোগে এ মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

গত ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট থেকে চার সপ্তাহের জামিন পেয়েছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের আওয়ামী লীগের এমপি আব্দুর রহমান বদি। পরে নি¤œ আদালত থেকেও জামিন পেয়ে এ পর্যন্ত মামলা মোকাবেলা করে আসছেন তিনি।

তথ্য অনুযায়ী, জীবনে প্রথম সংসদ সদস্য হওয়ার পর পাঁচ বছরে তার আয় বেড়েছে ৩৫১ গুণ। আর নিট সম্পদ বেড়েছে ১৯ গুণের বেশি। অভিযোগ রয়েছে, হলফনামায় বদি কেবল আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত অর্থ ও সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি গত পাঁচ বছরে আয় করেছেন ৩৬ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪০ টাকা। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও টেকনাফে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করে এ টাকা অর্জন করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি। হলফনামা অনুসারে এমপি বদির বার্ষিক আয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৮ টাকা। আর বার্ষিক ব্যয় ২ কোটি ৮১ লাখ ২৯ হাজার ৯২৮ টাকা।

এমপি বদি দেশব্যাপী আলোচিত এক নাম। তিনি ২০০৮ সালে প্রথম বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আলোচনায় আসেন বিভিন্ন মানুষকে মারধর করে। তার হাতে প্রহৃত হয়েছেন শিক্ষক, আইনজীবী, ঠিকাদার, ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ম্যাজিষ্ট্রেট, মুক্তিযোদ্ধা, দলীয় কর্মী ও বিদেশী এনজিও কর্মী। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের করা ইয়াবা তালিকায় এমপিকে অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বলে উল্লেখ্য রয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার চলছে সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির পৃষ্ঠপোষকতায়। ওই তালিকায় রয়েছে এমপি বদির ভাই ও আত্মীয়-স্বজন সহ নিকট আত্মীয়রা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মানবপাচারের তালিকায়ও রয়েছে এই এমপি বদির নাম। একই সঙ্গে ওই তালিকায় তার ভাই, ভাগ্নে সহ নিকট আত্মীয়দের নাম রয়েছে। নির্বাচন কমিশনারের রোহিঙ্গা বান্ধব জনপ্রতিনিধির তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন এমপি বদি।

একই সঙ্গে এমপি বদি এলাকায় বিএনপি-জামায়াত নেতাদের পৃষ্টপোষক হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকেন বলে দলীয় নেতা কর্মীদের অভিযোগ রয়েছে।

এমপি বদি দুদকের মামলায় কারাগারে প্রেরণ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতেয়াক আহমদ জয় বলেন, কক্সবাজারের মানুষ আইনের শাসনের পক্ষে। একজন দূনীতিবাজের বিরুদ্ধে এ রায়। বদির কারাগারে প্রেরণের মধ্য দিয়ে মানুষ বর্তমান সরকারের প্রতি আরো বেশি আস্থাশীল হল।

এদিকে, দুর্নীতি মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি আব্দুর রহমান বদির সাজার প্রতিবাদে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক অবরোধ করে বদি সমর্থক নেতা-কর্মীরা। এতে ৪ ঘন্টা পর্যন্ত এ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে এমপির বদি বিক্ষুদ্ধ কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উখিয়ার ৩ টি ষ্টেশনে সড়ক অবরোধ করেন।

উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের জানান, দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় এমপির বদির রায় ঘোষণার পর সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে উখিয়ায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন বদি সমর্থক নেতা-কর্মীরা। পরে তারা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের মরিচ্যা বাজার, কোটবাজার ও বালুখালী ষ্টেশনে সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিকাল সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করে। তবে এমপি বদির বিক্ষুদ্ধ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালনের আশ্বাস দিয়েছেন।

এর পূর্বে টেকনাফে বদি সমর্থিত নেতা-কর্মীরা মিছিল-সমাবেশ করেন।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like