২৩৬৭ গেরিলার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতি বহাল

fileআইন আদালত ডেস্ক : একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া ২ হাজার ৩৬৭ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সম্বলিত গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করেছে হাই কোর্ট।

বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি রুলের নিষ্পত্তি করে এ রায় দেয়।

আদেশের পর রিট আবেদনকারীর আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, গেরিলা বাহিনীর ২৩৬৭ জনের তালিকা সম্বলিত প্রকাশিত গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপনকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“যে তারিখে তাদের স্বীকৃতি প্রদান করে গেজেট হয়েছিল, সেই তারিখ থেকেই প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এই প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ডিসেম্বরে রিট আবেদনটি করেন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ও ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য।

২০১৩ সালের ২২ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২ এর ৭ (ঝ) ধারা মোতাবেক ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ২৩৬৭ জনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ করা হয়।

পরের ব্ছর ২৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ওই গেজেট বাতিল করা হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের একই বছরের ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভার সুপারিশ মতে ক্রুটিপূর্ণ ওই গেজেট বাতিল করা হল।

গেজেট বাতিলের ওই প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয় ডিসেম্বরে।

গত বছর ১৯ জানুয়ারি ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি করে  বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের বেঞ্চ গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করে।

সেই সঙ্গে দেওয়া রুলে ওই প্রজ্ঞাপনটি কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষরকারী উপসচিব ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাচের কমান্ডার (মাঝখানে) মনজুরুল আহসান খান। পারিবারিক অ্যালবামের ছবি।

ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন যৌথ গেরিলা বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাচের কমান্ডার (মাঝখানে) মনজুরুল আহসান খান। পারিবারিক অ্যালবামের ছবি।

১৯৭১ সালে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা একটি গেরিলা বাহিনী গঠন করে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্রও সমর্পণ করেছিলেন এই গেরিলারা।

আবেদনকারী পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার এবং স্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারসহ প্রতিটি সরকার এই বিশেষ গেরিলা বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার রায়ের পর তিনি বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে আদালত ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করেছে এবং সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটা যুগান্তকারী রায় আমরা পেয়েছি। আমরা খুব সন্তুষ্ট।

“এটি কেবল ২৩৬৭ জন গেরিলা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নয়, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি যে ভূমিকা পালন করেছেন, সেটার স্বীকৃতি। বাম প্রগতিশীলদের রাজনীতির প্রতিফলন এই গেরিলা বাহিনী।

“এটা গেরিলা বাহিনীর স্বীকৃতি তথা কনসালটেটিভ কমিটি মোজাফফর আহমেদ, মনি সিংহদের স্বীকৃতি।  এই যুদ্ধটা কেবল পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার যুদ্ধ না, এটা জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তির পক্ষে সকল শক্তির সম্মিলনে এই সংগ্রাম যে হয়েছিল, সেটার স্বীকৃতি এটা।

“সেই প্রকৃত ইতিহাসটা, সমগ্র জাতির সংগ্রামটা, সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ ও মিলিত সংগ্রামের স্বীকৃতি এটা। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক সত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

এই রায়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর ‘কালিমা লেপন ও সংকীর্ণতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা অপসৃত হবে বলে মনে করছেন একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা পঙ্কজ ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, “২০১৩ সালেই আমরা এই স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। সেটা আবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেড়ে নেওয়াটা ছিল আইন বিরোধী।

“আমাদের কিছু সংখ্যকের লাল বইতে নাম আছে। কয়েক হাজার। লিপিবদ্ধ হয়েছে। কিছু সংখ্যক বাদও পড়েছে। যেমন পীর হাবিবের নাম নাই, অনিল মুখার্জির নাম নাই, কাজী আব্দুল বারীর নাম নাই।”

ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীতে  আনুমানিক ১৯ হাজার যোদ্ধা ছিলেন বলে জানান পঙ্কজ।

“মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্থানীয়ভাবেও আমাদের প্রচুর রিক্রুটমেন্ট হয়েছে। ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম দেশের ভেতরে থেকেই যুদ্ধ করেছেন। তাদের অস্ত্র কিন্তু আমরা সংগ্রহ করে দিয়েছি।

“সরকার বাতিলের সময়ে বলেছে, দলীয় পরিচয়ে নাকি কোনো বাহিনী হয় না। এটা নাকি জামুকার একটা আইন আছে। কিন্তু এ রকম কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি। আদালত সরকারের সেই যুক্তি বাতিল করে দিয়েছে।

“যুদ্ধ কেউ ব্যক্তিগতভাবে করে না, যুদ্ধ করে কমান্ডের অধীনে। দলগতভাবে রিক্রুটমেন্ট হয়, দলীয়ভাবে ট্রেইনিং হয়, দলীয় সিদ্ধান্তে দলীয় কমান্ডারের অধীনে তারা যুদ্ধ করে, প্রাণ দেয়।”

  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like