ফাঁসিতে স্বস্তি, কাসেমের সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি

Dalim_Bhoban_Torcher_Cell_Ctg

                                                                                               ডালিম হোটেল

নিউজ ডেস্ক: মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন একাত্তরে চট্টগ্রামে এই বদর কমান্ডারের পরিচালিত ‘মৃত্যুঘর’ ডালিম হোটেলের নির্যাতিতরা।

এই ডালিম হোটেলে মুক্তিযোদ্ধা জসিমসহ ছয়জনকে হত্যায় শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে মীর কাসেমকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এরপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সেখানে নির্যাতিতদের কয়েকজন বলেন, এই শাস্তির মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। বুকের ওপর থেকে যেন পাথর নেমে গেছে তাদের।

মীর কাসেমের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করার দাবি করেছেন তাদের একজন।

একাত্তরে দেশ স্বাধীনের ২২ দিন আগে চট্টগ্রাম শহরের বাকলিয়া এলাকা থেকে ধরে পুরাতন টেলিগ্রাফ অফিস রোডে অবস্থিত ডালিম হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে।

মীর কাসেমের ফাঁসির পর তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে ১২ হাজার টনের বোঝা নেমে গেছে। জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।

“আমরা যারা সেখানে নির্যাতিত হয়েছি, যারা তাদের স্বজন হারিয়েছে তাদের মনের দুঃখ মিটেছে। আমি খুবই আনন্দিত তার ফাঁসি হওয়ায়। চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত হল।’’

ডালিম হোটেলে নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইলিয়াস বলেন, ওই কেন্দ্রে তাকেসহ বন্দি অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় প্রতিদিন অমানুষিক নির্যাতন করা হত। হোটেলের অনান্য কক্ষ থেকে মানুষের গোঙানির শব্দ শুনতে পেতেন।

“চট্টগ্রামের তৎকালীন বদর কমান্ডার কাসেম আলীই ডালিম হোটেলে হত্যা-নির্যাতনের নেতৃত্ব দিতেন।”

ডালিম হোটেলে নির্যাতিত অপর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মোহাম্মদ এমরান বলেন, “কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরে তার হাতে নির্যাতিত একজন হিসেবে আমি খুবই খুশি। তার ফাঁসি হওয়ার মাধ্যমে জাতি মুক্তি পেয়েছে।

“কিন্তু মীর কাসেমের বিশাল সাম্রাজ্য রয়ে গেছে। তা বাজেয়াপ্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যবহার করা হোক।”

ইমরান বলেন, মীর কাসেম আলী ও পাক সেনারা একাত্তরের ৩০ নভেম্বর চান্দগাঁও এলাকার বাড়ি থেকে তাকেসহ তার পরিবারের ছয় সদস্যকে ধরে নিয়ে আসেন।

“ডালিম হোটেলের দোতলার একটি কক্ষে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে আটকে রেখে প্রতিদিনই শারীরিক নির্যাতন চালাত। নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড  মীর কাসেমের নির্দেশেই হত।”

মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন নগরীর হাজারী লেইনের বাসিন্দা মৃদুল দে। ওই এলাকার বাসিন্দা টুনটু সেন ও রঞ্জিত দাশকে অপহরণের পর নির্মমভাবে খুনের ঘটনায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি।

একাত্তরের এই ঘাতকের ফাঁসি কার্যকরের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “যারা আঘাতপ্রাপ্ত, নির্যাতিত, মারা গেছে তাদের এবং তাদের স্বজনদের জন্য আজ শুভদিন। তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।”

ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কুকর্ম কেউ করতে না পারে সেজন্য এই শাস্তি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

ফাঁসি কার্যকরের প্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “সে চট্টগ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিল। ৪৫ বছর পর ফাঁসির সাজা কার্যকর হল, এটি চট্টগ্রামের জন্য আনন্দের।

“মীর কাসেমের হাতে নির্যাতিত হিসেবে আমি এ দণ্ড কার্যকরে অত্যন্ত খুশি, দেশবাসীও খুশি। এ শাস্তি তার প্রাপ্য ছিল। কোনোক্রমেই এর কম হওয়া উচিত ছিল না।”

ডালিম হোটেলে নির্যাতনের শিকার মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, “আজ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশাল দিন। প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার বিচার আজ আবার পেলাম।

“এটা আল্লাহর বিচার। এ বিচার ধীরে ধীরে হয়। টাকা দিয়ে সে বিচার কিনতে চেয়েছিল। সে ২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে বাঁচার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের একটি লবিস্ট প্রতিষ্ঠানকে এ টাকা দিয়েছিল।”

মীর কাসেমের সব অর্থ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় কাজে এবং নদীভাঙা ও দরিদ্র লোকজনের কাজে এ অর্থ ব্যবহার করা হোক।”

ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর বলেন, “মীর কাসেম একাত্তরে দেশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সর্বশেষ বাংলাদেশকে মৃত্যুপুরী সিরিয়া বানাতে চেয়েছিল সেটাও পারল না।”

-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like