শপথ ভেঙেছেন কামরুল-মোজাম্মেল: সুপ্রিম কোর্ট

Kamrul+Mojammel

মার্চ ২০১৬। অবমাননা মামলার শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

আইন-আদালত ডেস্ক: আদালত নিয়ে মন্তব্য করে অবমাননার দায়ে দণ্ডিত দুই মন্ত্রী তাদের ‘সংবিধান রক্ষার শপথ ভেঙেছেন’ বলে জানিয়েছে আপিল বিভাগ।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাস আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যে সাজা দিয়েছিল, সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে এর উল্লেখ করেছে সর্বোচ্চ আদালত।

যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর চূড়ান্ত রায়ের আগে সর্বোচ্চ আদালতকে নিয়ে করা মন্তব্যের জন্য দুই মন্ত্রীর নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন আট সদস্যের আপিল বিভাগ গত ২৭ মার্চ ওই রায় দেয়। সেই রায় বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রায়ে বলা হয়, “সংবিধানে বর্ণিত আইনের শাসন রক্ষার যে শপথ বিবাদীরা নিয়েছেন, সেই দায়িত্বের প্রতি তারা অবহেলা করেছেন।

“তারা আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণে তাদের শপথ ভঙ্গ করেছেন।”

সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে হওয়া এই রায় লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে তাদেরকে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ কলেও ‘শপথ ভঙ্গ’ সংক্রান্ত বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে সংযুক্তি দিয়েছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার রায়ের বিষয়ে বিচারপতি ইমান আলীর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

অন‌্যদিকে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর লেখা সংযুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক।

বিচারপতি ইমান আলীর সঙ্গে অপর চার বিচারপতি একমত পোষণ করায় সংখ‌্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার লেখা রায়ই আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

‘সহানুভূতি পাওয়ার অযোগ‌্য’

রায়ে বলা হয়, “অবমাননাকারীদের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, তারা আপিল শুনানির বেঞ্চ থেকে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নিজেদের ইচ্ছা অনুসারে রায় পেতেই হবে- এমন প্রত্যাশার প্রকাশ ঘটিয়ে তারা সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন কর্তৃত্বের প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছেন। তাদের বক্তব‌্যে আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞার প্রকাশ ঘটেছে।”

আপিল বিভাগ বলেছে, “সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকে আইন অনুসারে রায় দেওয়ার কর্তৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু বিবাদীরা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে কোন ধরনের রায় দিতে হবে, সেই নির্দেশনা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাদের ওই বক্তব্যে একটি সুনির্দিষ্ট পথে ন্যায়বিচারকে পরিচালিত করার ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, যা সবার জন‌্য আইনি সুরক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিতের বিষয়ে সংবিধানের দেওয়া ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

দুই মন্ত্রী সংবিধান অনুযায়ী আইনের শাসন রক্ষার শপথ নিলেও ওই বক্তব‌্যের মধ‌্য দিয়ে তাদের সেই দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করেছেন বলে রায়ে বলা হয়েছে।

“বিবাদীদের কথাগুলো যেভাবে এসেছে, তাতে তারা যে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেগুলো বলেছেন- তা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই এবং তারাও স্পষ্টভাবে অপরাধ স্বীকার করেছেন। তারা আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং মন্ত্রী হওয়ার সময় নেওয়া সংবিধান রক্ষা ও সংরক্ষণে শপথ ভঙ্গ করেছেন।”

“নিজেদের উত্তেজনার মধ‌্যে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বিচার বিভাগের পবিত্রতাকে হেয় করেছেন। সংবিধান অনুসারে সবাইকে আইন মানতে হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তও সংবিধান অনুসারে আইন যা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আদালতের রায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টার মধ‌্য দিয়ে বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টকে কলঙ্কিত করেছে। এটা গুরুতর ফৌজদারি অবমাননা এবং সংবিধানের লঙ্ঘন। এই অবমাননাকারীরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারেন না।”

দ্বিমত

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী তার রায়ে বলেছেন, “আমি আমার ভাই মোহাম্মদ ইমান আলীর রায় পড়েছি। অবমাননাকারীদের দোষী সাব্যস্ত করা এবং তাদেরকে দেওয়া দণ্ডের বিষয়ে দ্বিমত পোষণের কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। তবে অবমাননাকারীদের শপথ লঙ্ঘন বিষয়ক অংশের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করতে পারছি না।”

এর ব‌্যাখ‌্যায় তিনি বলেছেন, আদালত অবমাননাকারীরা তাদের শপথ ভেঙেছেন কি-না, তা এ মামলার বিচার্য বিষয় ছিল না। মন্ত্রিসভার এই সদস্যদের প্রতি ওই ধরনের কোনো নোটিসও দেওয়া হয়নি।

“আমার মত হচ্ছে, তাদেরকে উদ্ধৃত করে পত্রিকায় যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তার মাধ্যমে তারা আদালত অবমাননা করেছেন কি-না, সেটাই আমাদের বিবেচনার বিষয়।”

আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করে মন্ত্রী কামরুল ও মোজাম্মেলকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। ওই অর্থ সাত দিনের মধ্যে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশে দিতে বলা হয়। পরে তারা সেই অর্থ পরিশোধও করেন।

মন্ত্রী থাকা উচিত?

গত মার্চে আপিল বিভাগের ওই রায়ের পর দুই মন্ত্রীর পদত‌্যাগের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সে সময় বলেছিলেন, দুই মন্ত্রী থাকবেন কি না- সরকারই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বিষয়টি ‘নৈতিকতার’।

বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে দুই মন্ত্রীর শপথ ভঙ্গ হওয়ার বিষয়টি আসার পর এ বিষয়ে আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাননি মাহবুবে আলম।

সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের পর দুই মন্ত্রীর আর পদে থাকা উচিত কি-না, এ প্রশ্নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, “এখন এটা তারা বলবে। তারা শপথ নিয়েছেন, আরও একধাপ এগিয়ে পরিষ্কার করতে হলে তাদেরকেই করতে হবে।”

এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কোনো মন্তব‌্য রায়ের পর পাওয়া যায়নি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like