মধ্যপ্রাচ্যে যে কারণে চাকরি হারাচ্ছে বাংলাদেশি নারীকর্মীরা

omen-leber

নিউজ ডেস্ক: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশে বাংলাদেশ থেকে নারীশ্রমিক পাঠানোর হার বেড়েছে। তবে তাদের বিরাট একটি অংশকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি আরব। মূলতঃ অদক্ষতাই এসব নারীকর্মীদের প্রধান অযোগ্যতা। এছাড়া অল্প বয়স, বেশি বয়স, অসুস্থতা প্রভৃতি কারণেও কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে অনেককে।

তবে যৌন হয়রানি, খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত হতে না পারা, সৌদি সমাজ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা না নিয়ে যাওয়া, বাড়ির প্রতি টান প্রভৃতি কারণে স্বেচ্ছায়ও দেশে ফিরে এসেছেন অনেক নারী।

বাংলাদেশ সরকারের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিদেশে কর্মরত নারীশ্রমিকদের সমস্যা খুঁজতে গত মাসে সৌদি আরব ও লেবানন সফরে যায় সরকারের দুটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ফিরে এসে তারা এমনই সব সমস্যার কথা জানিয়েছেন বলে প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রতিনিধি দলে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলতঃ অধিক হারে কর্মী পাঠানোর আশায় নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে লেখাপড়া না জানা নারীদের সৌদি আরব কিংবা লেবানন পাঠানো হয়েছে। ভাষাগত সমস্যা তুলনামূলক দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারলেও কাজে অদক্ষতার কারণে অল্পদিনেই তাদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন নিয়োগকর্তারা।

তবে সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন বাংলাদেশি নারীদেরও সন্ধান পেয়েছে প্রতিনিধি দল।

এর আগে বিভিন্ন সময়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ মিডিয়াতে প্রকাশ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা এর সত্যতা নানা সময়ে অস্বীকার করা হয়েছে। এমনকি বিদেশগামী নারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও আত্মতুষ্টিতে ভুগতে দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। এবার খোদ সরকারি প্রতিনিধি দলের অনুসন্ধানেই আগে করা অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে এলো। এর মধ্য দিয়ে সরকার দেরিতে হলেও এবার প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে সৌদি আরবে ও লেবাবনে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের অবস্থা দেখে এসে দক্ষ নারীকর্মী তৈরি করার সুপারিশসহ সরকারের কাছে নানা সুপারিশ পেশ করেছে প্রতিনিধি দল। পাশাপাশি নারীকর্মীদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের প্রতিও সুপারিশমালা রেখেছে তারা।

জানা যায়, সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে দক্ষ নারীকর্মী পাঠানোর প্রতি মনোযোগ দেওয়ার আহবান জানিয়েছে প্রতিনিধি দল। এক্ষেত্রে বিদেশগামী নারীদের পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সেখানে সৌদি কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত করা, সুষ্ঠুভাবে মেডিকেল চেকআপ করানো, মেডিকেলের পর পরিবারের সঙ্গে থাকতে না দেওয়া,  প্রশিক্ষণের পর বাছাই করে বিদেশে পাঠানোসহ নানা সুপারিশ করা হয়েছে।

একইভাবে সৌদি সরকারের প্রতিও সুপারিশ রাখা হয়েছে। তাতে বেশ কিছু কাজ করতে বলা হয়েছে সৌদি সরকারকে। এসবের মধ্যে আছে: সঠিক ও নির্বিঘ্ন কর্মপরিবেশ তৈরি করা, যৌন নিপীড়ক গৃহকর্তাকে বিচারের আওতায় আনা, কিভাবে বিদেশি কর্মীদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে গৃহকর্তাদের ধারণা দেওয়া, গৃহকর্মীদের দায়িত্ব ঠিক করে দেওয়া ও কাজের ধরন কি হবে সেজন্য একটি চার্ট তৈরি করে দেওয়া।

এ বিষয়ে প্রতিনিধি দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য বলেন, ‘‘বেশিরভাগ বাংলাদেশি নারীকর্মীদের সমস্যা হচ্ছে অদক্ষতা। তাছাড়া পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়ে চলতে না পারা। এ কারণে অনেকেই বাড়ি ফিরে আসতে চান। তবে এর পাশাপাশি যৌন হয়রানির শিকারও হন অনেকে। যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীরও সন্ধান পেয়েছে প্রতিনিধি দল।’’

সৌদি আরবে বাংলাদেশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে আশ্রয় নেওয়া দুই’শ নারীর মধ্যে যৌন হয়রানির শিকার তিনজন নারীকে পাওয়া গেছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তাঁর মতে, “একজন নারীও যদি এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলেও আমরা প্রতিবাদ জানাব এবং জানিয়েছি।”

এসব বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, “আমরা বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর বিষয়ক নীতিমালা ও কর্মকৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বাছাই করাসহ সব ক্ষেত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ শেষে নারীদের বিদেশ পাঠানো হবে। না হলে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে বাজার হারাবো।”

এক্ষেত্রে সৌদি আর ও লেবানন-ফেরত প্রতিনিধি দলের সুপারিশ সরকার ইতিবাচকভাবেই দেখবে বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে অভিবাসী নারী কর্মীদের সংগঠন বমসার পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন পরে হলেও সরকারের টনক নড়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ নারীকর্মী তৈরির প্রতি জোর দেওয়ার আহবান জানিয়ে আসছি। কিন্তু সরকার সংখ্যা বাড়ানোর নেশায় অদক্ষ থেকে শুরু করে অল্পবয়সী মেয়েদেরও বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। এখন পরিস্থিতি বদলানো গেলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্যে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।”

-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like