বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমিতে যে চক্র জড়িত ।। অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ

3157336266_64857e7279_z-696x205বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের পিতা, স্থপতি। রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৫ সনে ১৫ই আগস্ট  খুনি ফারুক-রশিদ তাকে পরিবারসহ হত্যা করে। দীর্ঘ চারদশক পর হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। কেননা হত্যাকাণ্ডের নেটওয়ার্ক ছিল বহু বিস্তৃত এবং দূরবর্তী। বহু চক্র হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের পটভূমিকায় সেই সময়কার রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্রের তালিকা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরী। বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার, স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের সম্পর্ক ও লবি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্যাদি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের উদঘাটনে যথার্থভাবেই সহায়ক হবে সন্দেহ নেই।

১. ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে ভয়ানক উদ্বিগ্ন করে তোলে প্রধানত দুটি বিষয়। এক. আইন শৃঙ্খলার ক্রম অবনতি ও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা। দুই. আসন্ন খাদ্য সংকট। এই দুটি সমস্যা মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আইন শৃঙ্খলা অবনতিরোধে তিনি কাউন্টার টেরিরিজম বিষয়ে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেন। অন্যদিকে খাদ্য সমস্যা মোকাবিলায় বাধ্য হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্ত হন। তিনি এমন সব ব্যক্তিদের নিয়োগ দেন যারা ছিল মার্কিন মিত্র সি, আই, এ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। এদের অধিকাংশই ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫০ সন থেকে ১৯৭৩ সন পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সার্ভিস পরিচালিত হয়েছে যার লক্ষ্য ছিল, মিত্র দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার উন্নতি সাধন ও মার্কিন প্রণীত লক্ষ্য অর্জন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৩ সনের মার্চ মাস হতে বাঙালী পুলিশ অফিসারদের জন্য ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সার্ভিস স্কুলে ও ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণের দ্বার উন্মুক্ত করেন। একই সাথে অফিস অব পাবলিক সেফটির কর্মকর্তারা ঢাকায় মোতায়েন হন। এদের মধ্যে রবার্ট, লিও ক্লে, মন্টস, ওবভাল ডনার ঢাকার পুলিশ ও গোয়েন্দা ট্রেনিং তদারক করতেন।  এদের অনেকেই সি. আই-এ নেট ওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন।

৩. পুলিশ প্রশাসন: বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে ১১৩ জন পুলিশ কর্মচারী আমেরিকায় ‘ইনপোলসে ট্রেনিং নিয়েছেন। এদের মধ্যে চলি­শ জন ছিলেন ইন্টেলিজেন্সের অফিসার, যারা সি.আই-এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এদের মধ্যে এ, বি, এস সফদর, আবদুল রহিম, এস এ হাকিম, মুসা মিয়া চৌধুরী, সৈয়দ আমির খসরু, এম এন হুদা, এ কে এম মোসলেহ উদ্দিন, আবু সৈয়দ শাহজাহান, এ এম এম আমিনুর রহমান, গোলাম মোর্শেদ আলী, মোহাম্মদ জামসেদ, আবদুল খালেক খান, এ এই্চ নুরুল ইসলাম, জাফরুল হক, খন্দাকার গোলাম মহিউদ্দিন প্রমুখ। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন চৌ এন লাই-এর ঘনিষ্ঠ খাজা মুহাম্মদ কায়সার যিনি হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বার্মায় রাষ্ট্রদূত করেন।

৪. বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স বা এন, এস আই নামে বাংলাদেশের ইন্টেলিজেন্সীর নামকরণ করলেন। এবং ৭৪ সনে ডিরেক্টরের দায়িত্বে নিয়োগ করলেন এ, বি, এস সফদরকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সফদর ও আবুদর রহিম মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অধীনে চাকুরীতে যোগদান করেন। এ, বি, এস সফদর   পাকিস্তান সামরিক জান্তার অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসাবে ১৯৭০ সনে কেন্দ্রীয় ইন্টেলিজেন্সীর পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ব্যুরোর প্রধান এন, এ রিজভীর বিশ্বস্ততা একজন। এ, বি, এস সফদর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের কাজে যোগদান করেন আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের বিশিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে আবদুর রহিম তার দক্ষতা প্রমাণে তৎপর হন।

৫. বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোশতাক সফদরকে এন, এস, আই ডাইরেক্টর জেনারেল পদে প্রমোশন দিলেন এবং আবদুর রহিমকে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারিয়েটে প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেন, যিনি ইয়াহিয়া খানের রাজাকার বাহিনীর প্রধান হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কাজ পরিচালনা করতেন। জিয়াউর রহমানের সময় তিনি পদোন্নতি পেয়ে সংস্থাপন বিভাগের সচিব নিযুক্ত হন।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর পর এম, এন হুদা স্পেশাল ব্রাঞ্চের পদস্থ কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এন, এস, আই এর ডেপুটি ডাইরেক্টর পদে সফদরের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে কাজ করতে থাকেন। লিফস্যুজ লিখেছেন, ১৯৭৬ সনের জুন মাসে তিনি এন, এস, আই হেড কোয়ার্টারে এক সাক্ষাৎকারে হুদাকে জিজ্ঞেস করেন যে, তারা বঙ্গবন্ধু হত্যা সম্পর্কে জানতেন কিনা অথবা হত্যায় তারা জড়িত ছিলেন কিনা? লিফস্যুজ লিখেছেন, `Huda loughed and said the question was very, very clever one. But he would not answer”

এ এম আমিনুর রহমান ১৯৭০ সনে পাকিস্তান আর্মির প্যারা মিলিটারী কমান্ড কাউন্সিলের মৌলানা মান্নানের সঙ্গে মত ও পথের দিক থেকে তিনি খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ফোর্সের তিনি কমিশনার নিযুক্ত হন। এ কে, এম মুসলেইউদ্দিন ১৯৭১ সনে মুসলিম লীগ ও সামরিক জান্তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে কাজ করেন। তিনি এন,আই-এর পদস্থ ব্যক্তি হিসেবে কাজ পরিচালনা করতে থাকেন। আমির খসরু ১৯৭১ সনের একজন কলাবোরেটর। বঙ্গবন্ধু তাকে পুলিশ ক্যাডার হতে সরিয়ে এনে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব পদে নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরপরই তাকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুসামিয়া চৌধুরীকে প্যারামিলিটারী আর্মি ব্যাটিলিয়ান সংগঠনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৬৮-৬৯ সনে আয়ুব মোনায়েমের শাসনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন এবং ঐ সময়ে শ্রমিক আন্দোলন দমনের জন্য কর্তৃপক্ষের সুনাম অর্জন করেন। তিনি ফা. ও. তে কর্মরত ছিলেন।  বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তিনি স্বরাষ্ট্র সচিবের পদে অধিষ্ঠিত হন এবং বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের হাজার হাজার অনুসারীদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যায় পুলিশ বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের অফিসারগণ ছিলেন নির্বিকার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বে রাত ১২টার পর হতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তদানীন্তন ১১টি টিমের বিভিন্ন ব্রাঞ্চের লোক উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাদের এই সম্মিলিত শক্তি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রাক্কালে কোনই কাজে আসেনি। অথচ বঙ্গবন্ধু এদের উপর আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছিলেন যাতে তারা পূর্বেকার দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড ভুলে গিয়ে জাতির সেবায় নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের মেধা, দক্ষতা নিয়োজিত করে।

৬. বেসামরিক প্রশাসন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন সময়ে বাঙালি সি, এস,পি অফিসারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮০ জন। এবং ই,পি,সি, এস অফিসারের সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। বাঙালি সি, এস,পি অফিসারদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন মুক্তিযুদ্ধে মুজিব নগরের প্রবাসী সরকারের সংগে যোগদান করেছেন। ডঃ মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত প্রশাসন ও চাকুরী পুনর্বিন্যাস কমিটি সি, এস পি সিস্টেমকে আর্টিফিশিয়াল ইনস্টিটিউশন নামে আখ্যা করে সকল বড় বড় পদ সি এস পি অফিসারদের প্রাপ্য এই প্রথা ও নিয়মকে বাতিল করে দেয়। এতে সি, এস, পি অফিসারগণ ফুঁসতে থাকেন। তারা  আড্ডা মেরে, গালগল্প করে সময় কাটাতে থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনার এই কঠিন সময়ে তাদের ছিল গা-ছাড়া ভাব। আর একজন স্বনামধন্য প্রাক্তন সি এস পি অফিসার হলেন শফিউল আযম। বঙ্গবন্ধু কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন আমার প্রশাসনের শতকরা ৮০ ভাগ কলাবোরেটর। সেই প্রশাসন দিয়েই বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে অগ্রসর হন যা ছিল একটি ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত। মার্শাল টিটো বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ অফিসারদের নিয়ে পুরানোদের বাদ দিয়ে প্রশাসন সাজাতে। টিটো সে দেশে বিপ্লবের পর তাই করেছিলেন। কেননা তরুণ অফিসারদের তেমন অভিজ্ঞতা না থাকলেও দেশপ্রেম তাদের সে অভাব পূরণ করবে। বঙ্গবন্ধু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।

৭. সামরিক বাহিনী: ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জোওয়ানদের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার। তার মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যাগত জওয়ানদের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী শৃঙ্খলা বাহিনী জওয়ান ও মুক্তিযুদ্ধের নতুন করে রিক্রুটদের মিলিয়ে সর্বমোট ছিল ২৭ হাজার। পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের সংখ্যা ছিল ১১ শত। তারা ছিল রক্ষণশীল, ভারত বিদ্বেষী এবং স্বাধীনতা বৈরী ও পাকিস্তান অনুগত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তারা বিশ্বাস করতেন না। বাংলাদেশে তাদের মাইনে সুযোগ সুবিধা কমে গিয়েছিল। কেননা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গঠনে প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল শতকরা ১৩ ভাগ। সেনাবাহিনীর ভেতর ও বাইরে থেকে প্রচারিত হতে থাকল যে, বঙ্গবন্ধু ও তার সরকার সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও ভারত নির্ভর করে রাখতে চায়। ফলে যে সব মিথ্যাচার বাজারে গুজব আকারে চালু ছিল তাতেই তারা বিশ্বাস স্থাপন করত। সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভারত বিদ্বেষী মনোভাব ক্রমান্বয়ে মুজিব বিরোধী মনোভাবে রূপান্তরিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর সরকার অবিভক্ত বাংলার সিভিল সার্জেন্ট ও প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সচিব জনাব এ, রবকে প্রধান করে তিন সদস্যের জাতীয় পে কমিশন গঠন করেন। কমিশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর পে- স্কেল সম্পর্কে তিনি প্রস্তাব করেন, ÒBangladesh should have pay policy involving sharing of hardship in an equitable manner.” অন্যদিকে জিয়া চক্রের প্রচার ছিল বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও অক্ষম রাখতে চায়। রক্ষীবাহিনী যাদের সংখ্যা ছিল ২০ হাজার তাদের শক্তিশালী করতে চায়। সিনিয়ার অফিসার দুভাবে বিভক্ত। জিয়া দুই দিকে উস্কানী দিতেন। ১৫ই আগস্টের খুনিদের সাথেও জিয়ার যোগাযোগ হয় এবং ষড়যন্ত্রকারীরা অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমানের অনুমোদন ছিল তা কর্নেল রশিদ প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে ও লিখিতভাবে বলেছে। কর্নেল অব. শওকত লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের ষড়যন্ত্রণামূলক কার্যকলাপের অনেক খবরই বঙ্গবন্ধু রাখতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মোটেই বিচলিত হতেন না। একবার তাঁকে হাসতে হাসতে বলতে শুনেছি “জিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা। এখনো ছেলেমানুষ। দেশের অবস্থা ভালো না। তাই মাঝে মাঝে আমার উপর অভিমান করে একটু আধটু ষড়যন্ত্র করে।” “এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে জিয়াউর রহমানের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া ১৯৭৫ সালেই ১৫ই আগস্টের তথাকথিত অভ্যুত্থান ঘটাতে কেউ সাহস পেতো না।”

৮. প্রতি বিপ্লবের কালো হাত: লে. কর্নেল আবু তাহের, ও লে. কর্ণেল জিয়াউদ্দিন (জাসদের মেজর জিয়াউদ্দিন নয়) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শে তাড়িত হয়ে সেনাবাহিনীতে কিছু কিছু শৃঙ্খলা বিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। এসময় বাংলাদেশে ভূট্টো ‘মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে জোরেশোরে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চীনপন্থিরা সমগ্র দেশে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। খুন, ডাকাতি, হাইজ্যাকে লিপ্ত হয় অন্যদিকে বিপ্লবের কথা স্লোগান দেয়। জাসদের কার্যক্রম প্রতিবিপ্লবীদের হাতকে শক্তিশালী করে। এই প্রেক্ষিতে কাউন্টার ইনটেলিজেন্সিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অফিসাররা গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢুকে পড়ে।

৯. ফুঁসে থাকা শিল্পপতি: শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শোষণের যন্ত্র জাতীয়করণ করেন। শোষকদের উপর বঙ্গবন্ধু আঘাত করেন। লরেন্স জে, হোয়াইট দেখিয়েছেন, বাইশ পরিবার নয়, ৪৩ পরিবার সমগ্র পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ করত। বাঙালী শিল্পপতিদের মধ্যে এ, কে খান পরিবারের স্থান ছিল ৪৩তম। শিল্পপতি ছাড়াও এ কে খানের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। তিনি আয়ুব খানের আমলে পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু, এ, কে খান সহ বাঙালী শিল্পপতিদের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ করে পাট ও বস্ত্র, চিনি ও ভারী শিল্প জাতীয়করণ করেন। এ কে খানের এক ভাই এম, এস, খান। এই ভায়ের দুই মেয়ের দুই স্বামী খুনি কর্ণেল রশিদ ও ফারুক। আওয়ামী লীগ নেতা এম আর খান ছিলেন একই ঘরনার।

১০. জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকাণ্ড বিশাল ক্যানভাস। বিশাল এক মহামানবকে হত্যা করার লক্ষ্যে খুনি চক্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে যা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস বইটিতে কমবেশি বিধৃত আছে। আজো প্রতিবিপ্লবী শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৎপর। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। এর জন্য অবিলম্বে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা অপরিহার্য।

’৭২ খসড়া সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী। (লেখাটি পূর্ব পশ্চিম বিডি থেকে সংগৃহিত)

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like