৯০ বছর বয়সেও ইট ভাঙেন ‘সাদা বুড়ি’

383276e5a1f66262b5b3f8ab1fd18d38-90-years-old

প্রথম আলো : হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছিলেন এই নবতিপর। বয়সের ভার তাঁর শরীরে যতই চেপে বসুক, ন্যুব্জ নন তিনি। পাশ দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করেন, কেউ কেউ হঠাৎ থমকে দাঁড়ান। এই বয়সে ঘরে শুয়ে-বসে তাঁর আরাম করার কথা। এই কায়িক কষ্ট কেন?
নাম নীলপতি। তবে ‘সাদা বুড়ি’ বলেই জানেন পরিচিত ব্যক্তিরা। জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর জন্মসাল লেখা ১৯২৬। সে হিসাবে বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। এ নিয়ে পরোয়া নেই। আপনমনে ইট ভাঙায় ব্যস্ত তিনি। মাথায় ছোট করে কাটা চুলগুলো পাকা। পরনে সাদা শাড়ি। কথা বলার সময়ে জানান, ঠিক কবে হাতে হাতুড়ি নিয়েছেন, তা মনে করতে পারেন না। তবে সময়টা ২০ বছরের কম হবে না। অনেক আগে স্বামী মারা গেছেন। তখন থেকে কারও বোঝা হয়ে থাকবেন না—এই মনোভাব নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইটে হাতুড়ির ঘা বসানোর সময় কখনো কখনো তা নিজের হাতে লাগে। তবু থেমে যান না কখনো। দৃঢ় মনোবল তাঁকে শক্তি জোগায়।

এলাকাবাসী জানান, উপজেলার বাঙ্গালিপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর বাড়াইশাল হিন্দুপাড়ায় ‘সাদা বুড়ি’র বাড়ি। প্রতিদিন প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক হেঁটে শহরের বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) অফিসের সামনে ইট ভাঙতে আসেন তিনি। শরীরে শক্তি পান না তেমন। তবু কাজ করেন। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাতুড়ি দিয়ে ইট ভেঙে চলেন।

নীলপতির ভাষ্য, নিজের ভিটেমাটি নেই। তাই সরকারি খাসজমিতে ঘর তুলে আছেন। স্বামী ভোলানাথ চন্দ্র রায় অনেক আগে মারা গেছেন। সংসারে দুই মেয়ে এক ছেলে। ধারদেনা ও অতিকষ্টে মেয়েগুলোর বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে ভবেশ (৪৫) ভ্যান চালিয়ে রোজগার করেন। ছেলের সংসারে বাড়তি বোঝা হয়ে থাকতে চান না। তাই যত দিন শরীরে কুলাবে, তত দিন কাজ করে যেতে চান। নিজের আয় থেকে নাতি-নাতনির পড়াশোনার খরচও দেন তিনি।

বাঙ্গালিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাদা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, নীলপতির জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মসাল ১৯২৬ উল্লেখ করা আছে। তিন বছর ধরে তিনি বয়স্ক ভাতা পান। তবে মাসে ৪০০ টাকা ভাতায় তাঁর অভাব মেটে না বলে কাজ করে চলেছেন এই বয়সেও। তিনি বলেন, ‘আর্থিক দুরবস্থা থাকায় তাঁকে আমরা সরকারের খাসজমিতে ঘর তুলে থাকতে দিয়েছি। ওই জায়গা তাঁর নামে বরাদ্দ দেওয়া নেই। তবে চেষ্টা করছি যেন ওই জায়গা তাঁর নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
ছেলে ভবেশ বলেন, ‘সংসারে অভাব আছে এটা ঠিক। তা-ও বয়স হওয়ায় মাকে ইট ভাঙার কাজ করতে নিষেধ করি। কিন্তু মা শোনেন না। মায়ের ভয়, তিনি সংসারে বোঝা হয়ে যাবেন। সংসার থেকে তাঁর জন্য কোনো খরচ তো লাগেই না, উল্টো মা নিজের আয় থেকে নাতি-নাতনির পড়াশোনার খরচ দেন।’

বয়স হয়েছে, তাই দৃষ্টিশক্তিও কমে এসেছে। মাঝেমধ্যে হাতুড়ির আঘাত ইটে না পড়ে নীলপতির হাতে লাগে। এতে অসহ্য যন্ত্রণায় অনেক দিন কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর ডান চোখের মাংস বেড়েছে। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। কিন্তু যা আয় করেন, তা দিয়ে চিকিৎসার ব্যয় মিটবে না।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like