স্বপ্ন, সময় ও দেশিয় সিনেমা ।। জাহেদ সরওয়ার

lead-featureলুমিয়ের ব্রাদার্স চলচ্ছবির ক্যামেরা আবিস্কার করার পর প্রথমে ছিল একটা শটের কারিশমা। মানে ট্রেন আসছে। মানুষ প্রথম দেখল একটা চলমান ট্রেন তাদের দিকে আসছে। শব্দও ছিল না তখন। অই একটা শর্টেই নাকি কুপোকাৎ। মুর্ছা যেতো মানুষ। কারণ এই জিনিস তারা আর দেখে নাই আগে। তো তারা কেমনে বুঝবে এই ট্রেন আসল না। আসলের অনুকরণ হুবহু। সেটাই ছিল সিনেমা ভাষা। নির্বাক; কিন্তু ক্যামেরার অসিম শক্তি, শর্টের অসিম শক্তি। মহাত্মা তলস্তয় বলেছিলেন সেটাকে জীবনের গতি। আর কমরেড মাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন কদিন পরই এই গতিময় বস্তুটি হস্তগত হবে স্বার্থন্বেষি মুনাফাখোর বুর্জোয়াদের। তখন তারা পুঁজি করবে এমন সব বিষয়কে যাতে ভেসে যাবে সব নীতি নৈতিকতা। যেমন সিনেমার নাম হবে ‘যে মেয়েটি নগ্ন হচ্ছে’। আহা প্রিয় মাক্সিম যদি আজকে বিশাল পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি দেখে যেতে পারতেন! আর নানা ভাবে পর্ণকে সিনেমার কেন্দ্রে নিয়ে আসাকে দেখে যেতে পারতেন। তাহলে মানুষের উপর অর্জিত সমস্ত বিশ্বাসই বোধয় তিনি হারিয়ে ফেলতেন।

যখন সিনেমা রীতিমতো সবাক : সবাক মানেই তো গেয়ে উঠা। ছোট ছোট কাহিনির ফাকে গান। সেটা ছিল একটা মিওজিকাল ব্যালাড। কেউ কেউ বলেন অপেরা। ব্যাস, ভারতের চোখে তখন সেটাই হয়ে গেল সিনেমার ব্যাকরণ। এটা একটা ঐতিহাসিক ভুলবোঝাবুঝি। ভারত-সহ সাবকন্টিনেন্টে সিনেমায়, বলা যায়– যে কোনো ধরণের সিনেমায় সেটা সিরিয়াস হোক আর কমার্শিয়াল চার-পাঁচটা গান অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মিউজিকাল সিনেমায় ছাড়া খুব বেশি সিনেমায় গানের ব্যবহার হয় না সিনেমার পীঠস্থান আমেরিকাতেও বা আরো অন্যান্য সিনেমার কারখানায়। অথচ গান ছাড়া সাবকন্টিনেন্টের সিনেমা কল্পনাও করা যায় না এখন আর। যাইহোক একজন অভিনেতা অভিনেত্রিকে এখানে একাধারে নাচ জানতে হয়। গান জানলে তো আরো ভাল। বাকী সবতো আছেই।

লুমিয়ের ব্রাদার্সের সেই ট্রেনের শর্ট আর ক্লোজ আপ আজ গতির শীর্ষে। আরও অজস্র বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে সিনেমা নিয়ে, ক্যামেরার গতি নিয়ে। কাহিনি যেখানে গৌণ হয়ে আছে। সিনেমা হচ্ছে টোটাল ক্যামেরা ভাষা। যেটা এখনো আয়ত্ব করতে পারে নাই আমাদের দেশের চিত্রপরিচালকেরা। দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাজ কেউ লক্ষ্য করলে তারা তাকে এখনো স্থীরচিত্র বলে অভিহিত করবে। তাদের তৈরি সিনেমার পোস্টারটাই ভাল লাগে। ভেতরে কিছু নাই। বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে বলতে গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মুঘল বৃটিশ পাকিস্তান ইত্যাদির কলোনি থাকার কারণে এখানকার মানুষের আত্মবিশ্বাসের লেভেল প্রায় শূন্য পর্যায়ের। আছে কেবল আস্ফালন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে এমনকি ভারতেও শিক্ষিত বুর্জোয়াদের হাতেই সিনেমার বিস্তার হয়েছে। তবুও বিশ্বজুড়ে সিনেমার দুইটা ধারা, দ্বান্ধিক। এটা অ্যাঙ্গেলসের ন্যাচারাল কনফ্লিক্টের মতোই। একদিকে বাজেট কমিয়ে বক্তব্য প্রধান ফর্ম, অন্যদিকে বিশাল বাজেটের বিনোদন। এইভাবেই চলছে দুনিয়ার তাবৎ সিনেমা এরিনা। তবুও বলতে গেলে সিনেমা হচ্ছে একটা ব্যায়বহুল মাধ্যম। অনেক কিছুর সমন্বয়েই সিনেমা তৈরি হয় প্রতিটি পদক্ষেপে আছে অর্থের যোগান। তাই থিয়েটারে বা সিনেমা হলে লোকসমাগমের বিষয়টি থেকেই যায়। ফলে কেউ অনন্ত কাল ধরে দর্শকের দিকে না তাকিয়ে সিনেমা বানিয়ে যাবে, সেটা অসম্ভব প্রায়। আমরা যাকে সফল আর্টফিল্ম বলি, সেটাও অর্থের বিচারে হিট সিনেমা। শুরু থেকেই নতুন শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে সিনেমার যে জোয়ার। তার ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছিল। প্রত্যন্ত গ্রামেও টিনের ঘরে উপস্থিত হয়েছিল সিনেমা।

ষাট থেকে শুরু হয়ে নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই যাত্রা। শুধু কি সিনেমা হল? ভিসিআর-ভিসিপির যুগে গ্রামে গ্রামে মিনি সিনেমা হল গড়ে উঠছিল। এরপর সিডি-ডিভিডি হয়ে এখন একটা ফাইলে পরিণত হয়েছে সিনেমা। যার খুশি ডাউনলোড করে মোবাইলের ছোট পর্দায়ও সে সিনেমা দেখতে পারছে। ইন্টারনেট চালু হবার পর নানাভাবে সারা পৃথিবীর সিনেমাই এখন দর্শকের হাতের মুঠোয়। ফলে এখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটা বিশাল। এই বিশালতা ধারণ করতে না পারলে সেই অভিজ্ঞতা আর যোগ্যতা না থাকলে এখানে আর সিনেমা নিয়ে সারভাইব করা যাবে না।

বাংলাদেশের সিনেমার অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে, যে যা জানে না, তার তা করতে চাওয়া। এফডিসি নামের যে তেজগাঁয়ের সিনেমা বস্তি, ওটা জোঁকেধরা। ওখানে ছলেবলে কেউ একবার ঢুকতে পারলে সে আর বের হয় না; মানে, তাকে আর বের করা যায় না। এখানে দেখা যাবে অ্যাডিটিং যে করে, সে আসলে সেই বিদ্যার তেমন কিছু জানে না। পরিচালক নামের যেই মানুষগুলো, তারা হয়তো সিনেমাটা বুঝে না। এরা একধরনের মসলার যোগানদার। প্রডিউসার যারা, তারা আসে নারীমাংসের লোভে। আর সবচাইতে দুর্বল হচ্ছে তাদের স্ক্রিপ্ট আর সংলাপ নির্ভরতা। সবদেখে তেজগাঁয়ের সিনেমার বস্তিতে উৎপাদিত এসব সিনেমাকে মনে হবে এখনো একধরনের যাত্রাপালা। সিনেমাকে যেখানে সংলাপহীন করে ফেলার চেষ্টা চলছে সেখানে এখনো চিৎকার চেঁচামেচিকেই এখানে সংলাপ বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে অ্যাকশন ত্রিলারের সব কলাকুশলীকে মনে হবে, তারা কমেডিয়ান। ক্যামেরার যে মুভমেন্ট, সেটা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নাই। সিনেমার যে কাব্যিকতা, সেটা সম্পর্কে তাদের ধারণা নাই। আবার একধরনের টিভি নাটক নির্মাতারা সিনেমার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু তাদের সকল সিনেমাই শেষ পর্যন্ত টিভি নাটকে পরিণত হয়। তারাও বুঝে না, টিভি নাটক আর সিনেমা একজিনিস না। সেটা হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে ফারুকী পর্যন্ত– সবাই করেছে। আর টিভির অভিনেতারাতো সিনেমার অভিনয়ের স্বতন্ত্রতা বুঝতেই পারে না মনে হয়, যখন তাদের অভিনয় লক্ষ্য করা হয়। প্রত্যেক ভিজুয়াল ইন্ডাস্ট্রিতেই এইগুলা আলাদা আলাদা বিভাগ। ভারতের টিভি নাটকের অভিনেতাদের নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়, তবে সেটা খুব বেশি নয়। আর যারা অভিনয় করে, তারা সিনেমাটা বুঝেশুনেই করে। হলিউডেও তাই। একমাত্র এখানেই সেটা মানা হয় না।

আর একটা সমস্যাকে মেজর মনে হয়েছে; সেটা হচ্ছে, টিভি নির্মাতা বা ডেইলি সোপের নির্মাতাদের দিয়ে সিনেমা হয় না; কেউ তা করে না। ভারতের এত এত নামী পরিচালকদের মধ্যে কেউ টিভি নাটক নির্মাণ করে নাই সিনেমায় আসার আগে। ফলে তারা সিনেমার ভাষাটা রপ্ত করেই এসেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে দেশের অন্যান্য বিভাগের মতোই সিনেমাটাকেও অতি আবেগে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম হয়েছে। অনুদান দেয়ার নাম করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লবিংবাজ ও দলিয় ক্যাডারদের অনুদান দিয়ে আবার সে সব ফুটেজকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি এখানেও ছেয়ে গেছে। হুমহাম করে যে সব অনুদান দেয়া হয়, সেসব ছবি দেখার মতো না। এসব ছেলেপিলেরা সিনেমা বানায় নাই কোনোদিন, সিনেমার প্রতি তাদের কমিটমেন্ট বা ভালবাসাও নাই। তারা কেবল অনুদানের টাকাটার দিকে তাকিয়ে স্ক্রিপ্ট লিখেছে। সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় যদিও কথাটা। তবুও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখছে অবিরাম। পথ হাঁটছে সিনেমার। সিনেমা আগাগোড়াই যেহেতু একটা স্বপ্নময় মাধ্যম, সেহেতু স্বপ্ন দেখা ছাড়া উপায়ই বা কি?

আর স্যান্সরবোর্ড বলে যেই জিনিস আছে, সেটাতো আরো একদম আগানো ধ্বংসের কিনারার দিকে। এই করা যাবে না, সেই করা যাবে না! সেন্সরবোর্ডের আছে নিজস্ব রাজনীতি। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না, পুলিশ বাহিনির বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে নাগ তারা পৃথিবীর অন্যান্য সিনেমা দেখে কিনা সন্দেহ। ফলে সিনেমার যে রুদ্ধদ্বার, সেটা আসলে একদিকে না। নানা দিকেই তার বিস্তার। এসব ভেদ করে একজন তরুণ স্বাপ্নিক সিনেমা করার কথা চিন্তা করে ক্লান্ত হয়ে যাবারই কথা। তবু কেউ কেউ হয়তো দেশের বাইরে গিয়েও চেষ্টা করছে এই সব চোরাগলিগুলো এড়ানো যায় কিনা।

আবার সিনেমা নির্মাণ করার পর সেটা দেখানো নিয়ে তাকে পড়তে হয় সিন্ডিকেটের হাতে। সিনেমা হলের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। কারণ, ছোটপর্দায় দর্শক হলিউড বলিউডের যে তপ্ত সিনেমার স্বাদ পাচ্ছে, তাদের কাছে বাংলাদেশি সিন্ডিকেটবাজির সিনেমা নেহায়েত তুচ্ছ বিনোদন। ফলে একমাত্র গার্মেন্টকর্মি ও এই ধরনের পেশার মানুষ ছাড়া সিনেমার বিশাল মধ্যবিত্ত দর্শক মোটামুটি সিনেমাহল বিমুখ। তাহলে সিনেমা হল কেন থাকবে? এটা একটা বিশাল প্রশ্ন। কাহিনির কোনো নতুনত্ব নাই; একই স্ট্রাকচারাল মসলা সিনেমা। সিনেমা যেহেতু আন্তর্জাতিক মাধ্যম, সেহেতু এটার একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা আছেই। যার কারণে আমরা প্রায়শই বলি, আমাদের দেশে সিনেমার একি অবস্থা? অন্যান্য দেশের সিনেমা কোথায় আর আমরা কোথায়? একজন কিম কি দুক, একজন ইলমাজ গুণে না থাক; একজন অনুরাগ কাশ্যপ বা রামগোপাল ভার্মা কই আমাদের সিনেমায়! হবে না। কারণ, অশিক্ষিত সিনেমাঅন্ধদের সিন্ডিকেটবাজি। অশিক্ষিত রাজনীতির খপ্পরে পড়া সিনেমাবাজি।

লেখক : কবি ও সমালোচক। সম্পাদক : ঢাকা রিভিউ। www.Dhakareview.org

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like