আব্বাস কিয়ারোস্তামি: বিশ্ব সিনেমার অঘোষিত ওস্তাদ

মঙ্গলবার সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর। ইরানের পুরনো শহর তেহরানের সিনেমা মিউজিয়ামের সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। সেখানে ইরানের সবচে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি থেকে একেবারে সবচেয়ে নগণ্য মানুষটিও এসেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি ইরানের শিল্প সাহিত্য আর সিনেমা অঙ্গনের মানুষ। অভিনেতা নির্মাতা প্রযোজক সবাই এক কাতারে মুখ কালো করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। এতো নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো নীদা সামাদি নামের এক নারী । নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলে এক ধরনের কটমট দৃষ্টি দিয়ে গর্দান উল্টিয়ে অনেকেই তাকালো তার দিকে। কিন্তু এই বিষয়ে ওই মেয়েটির মোটেও ভ্রুক্ষেপ নেই। হাতে ফুল আর চোখে অনবরত জল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

উপস্থিত কিছু সাংবাদিকের চোখ এড়ালো না বিষয়টা। এত শোকের মাঝেও সবাই যেখানে চুপচাপ সেখানে তিনি থেমে থেমেই ডুকরে কেঁদে উঠায় কারণ জিজ্ঞেস করতে এগিয়ে গেলেন একজন। মুহূর্তেই একজনের জায়গায় কয়েকজন সাংবাদিক ঘিরে ধরলো ওই নারীকে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তখনো, কিন্তু নীদা সামাদি বললেন, তিনি তেহরানের মেয়ে নন। এসেছেন সাড়ে বারো’শ কিলোমিটার দূর থেকে। বন্দর আব্বাস থেকে সুদূর তেহরানে এসেছেন কেবল বিশ্ব সিনেমার মহান স্রষ্ঠা আব্বাস কিয়ারোস্তির মৃত্যুর খবর শুনে। তার সামনে নীরবে একটু দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে।

কিন্তু কিয়ারোস্তামিতো তখনও শিল্প সাহিত্যের নগর প্যারিসে। তার মৃত দেহটিতো এখনো দেশে নিয়ে যাওয়া হয়নি। কিন্তু তারপরও অনুপস্থিত কিয়ারোস্তামির দিকে আঙুল তুলে মেয়েটি বললো, এই লোকটা তার সিনেমার ভেতর দিয়ে আমার মতো অসংখ্য মানুষের জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে, জীবনকে ভালোবাসতে সুযোগ করে দিয়ে গেছেন। সামান্য একটা চেরি ফলকে পুঁজি করে যে জীবনকে সব রকমের বিতৃষ্ণা থেকে পজিটিভ দিকে নিয়ে যেতে পারে তাকে সম্মান জানাতেই আমি এসেছি।

তাহলে কী নীদা সামাদি জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে কখনো আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত হয়েছিল? এবং আব্বাস কিয়ারোস্তিামির ‘টেস্ট অব চেরি’ সিনেমা দেখে জীবনের সন্ধান খুঁজে পেয়েই নির্মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই সে এখানে এসেছে? হ্যাঁ। ঘটনা একদম তাই!

চারদিকে মুহূর্মুহূ হত্যা, মৃত্যু, শোক আর সহিংসতাকে পাশ কাটিয়ে বিশ্বজোড়ে সোশাল সাইট আর সমস্ত গণমাধ্যমজুড়ে গত দুই দিন ধরে শুধুই একটি নাম। আব্বাস কিয়ারোস্তামি। একজন স্রষ্ঠার নাম। যিনি সত্যিকার অর্থেই গত চার দশকের বেশি সময় ধরে টানা রাজত্ব করে চলেছেন বিশ্ব সিনেমাজুড়ে।

সিনেমার ভেতর দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ানো, কিংবা কখনো জীবনকে স্থুল আর সমস্ত অর্থহীনতার সামনে দাঁড় করিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছেই নিয়ে যাওয়ার কারিগর তিনি।

বিষয় বৈচিত্র গল্প ভাবনা কিংবা ক্যামেরার কারিকুরি আর নতুন উদ্ভাবনের দিক দিয়ে হয়তো কিয়ারোস্তামি ইরানি অন্যান্য জনপ্রিয় নির্মাতাদের মত হয়তো সরল নন। তার নির্মাণ, গল্প বলার ধরন সবইতো মোটামুটি উত্তেজনাহীন। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে একবার এই উত্তেজনাহীনতার ভেতর ঢুকে গেলেই হয়তো আবার সরল, সতেজ আর উত্তেজনায় ঠাসা! তিনি সিনেমার পরতে পরতে নেচারালনেস চাইতেন। ছবিটাকে যতোভাবে পারা যায় তিনি বাস্তবতায় মুড়িয়ে দিতেন। তার চরিত্ররা কখনোই অভিনয় করেনি। অলিভ ট্রি, উইন্ড উইল ক্যারি আস, টেস্ট অব চেরি কিংবা শিরিন সিনেমার সেই দর্শকগুলোর অভিব্যক্তি যেভাবে প্রাণবন্ত করে তিনি নির্মাণ করলেন যেকেউ হয়তো ছবিগুলোকে চরিত্রের আড়ালে লুকিয়ে দৃশ্যধারণ করা বলে ভেবে বসতে পারে।

তার সিনেমায় ‘নেচারালনেস-এর বড় উদাহারণ ‘ক্লোজ আপ’ নামের সিনেমাটি। যেখানে ইরানের আরেক তুখোর নির্মাতা মহসিন মাখমাল্বাফকে দিয়ে ঠিক তার অভিনয়টায় করিয়েছেন তিনি। আর এই ছবিটি সত্যিকার ঘটনায় নির্মিত।

কিয়ারোস্তামির সিনেমায় প্রধান সুবিধাটা হচ্ছে, একজন কবি যখন কিয়ারোস্তামির সিনেমা দেখেন তখন সে কাব্যরসমৃদ্ধ সমস্ত ব্যাপারই তার সিনেমায় খুঁজে পাবেন। একইভাবে দর্শনবিদ, নির্মাতা এবং ভিন্ন ধাঁচের গল্প বলতে চাওয়া কোনো স্টোরি টেলারও।

যে উঠতি সিনেমা নির্মাতা কিংবা ভিন্ন স্বাদের গল্প বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন তিনি যখন আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমায় মগ্ন হবেন তখনতো তার নেশা পেয়ে যাওয়াটায় স্বাভাবিক। কারণ সিনেমা দিয়ে সম্মোহনীর যে অভূতপূর্ব ক্ষমতা তিনি তার পুরোটায় তিনি করে গেছেন জীবনভর ।

শুধু দর্শক আর সাধারণ ভক্তরাই তার অনুরগী নন। তাকে, তার সিনেমা স্টাইল মারাত্মকভাবে পছন্দ করেন এই সময়ের প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা থেকে একেবারে সিনেমায় হাতেখড়ি মানুষটিও। তার সমকালীন থেকে পরবর্তী সময়ে মননশীল সিনেমা শিল্প সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চা যারা করেন তারা সকলেই বিশ্ব সিনেমার এই অঘোষিত ওস্তাদের শিষ্য। আর তিনি যে কতোটা মানুষের হৃদয়জুড়ে ছিলেন তারও কিছুটা আঁচ পাওয়া গেল তার মৃত্যুর পর।

টুইটার ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে আব্বাস কিয়ারোস্তামির স্মৃতি নিয়ে চলছে মানুষের রোমন্থন। আফসোস আর চোখের জলে শোকে কাতর তার অনুসারি ও ভক্তশ্রেণি। যেকোনো ধরনের ইগো ঝেড়ে ফেলে তার সমসাময়িক আর পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতা বা আর্টিস্টরা অনায়াস ভঙ্গিতে গুরুর আসনে রেখে কথা বলছেন স্রষ্ঠা আব্বাস সম্পর্কে। কান্ডারী

তাইতো এমন শোকের দিনেও ইরানি সিনেমার জন্য আফসোস করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাবেদ জারিফ বলে উঠেন, বিশ্ব সিনেমা অঙ্গনে কান্ডারিকে হারালো ইরান। এমনকি তাকে ইরানি সিনেমার ওস্তাদ বলেও আখ্যা দেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত শোকে পাথর সংস্কৃতি মন্ত্রী আলী জান্নাতিও। আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে একজন মানবতাবাদী আখ্যা দিয়ে বিশ্ব সিনেমার অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি আব্বাস যে নতুন ধরনের সিনেমা ইরানে শুরু করেছেন তা বিশ্বজুড়ে আজ ছড়িয়ে গেছে বলেও আব্বাস কিয়ারোস্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন।

অন্যদিকে ইরানি সিনেমার আরেক ‘নিউ ওয়েব’ ও বিখ্যাত ছবি ‘দ্য চিলড্রেন অব হেভেন’ নির্মাতা কিয়ারোস্তামিকে একজন সত্যিকারের দার্শনিক আখ্যা দিয়ে বলেন, আব্বাস কিয়ারোস্তামি শুধু একজ্ন নির্মাতাই ছিলেন না বরং তিনি একজন দার্শনিকও।

২০১১ সালে ‘এ সেপারেশন’ নির্মাণ করে বিশ্বজুড়ে শুরগোল ফেলে দেয়া অস্কারজয়ী নির্মাতা আলি আসগর ফারহাদি। যিনি কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই বলতে পারেন, আব্বাসের জন্যই আজ ইরানি সিনেমা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তারজন্য তিনি নিজেও আজ নির্মাতা হিসেবে সম্মানিত। এমনকি ইরানে যারা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সবাই কিয়ারোস্তামির দেখানো পথের অনুসারি।

আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমা যাদের কাছে ফ্লো নাই বলে মনে হয় কিন্তু তাদের কাছে আবার বিশ্বখ্যাত হলিউড নির্মাতা ও অভিনেতা মার্টিন স্করসিসের সিনেমা বেশ উত্তেজনাপূর্ণ সেই স্করসিস বলেন, আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমা মানেই ওভারফ্লো। সৌন্দর্য আর শৈল্পিকতায় মোড়ানো।

জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ মানুষদের জীবনের সন্ধান দিয়ে, বেঁচে থাকার মুমেন্ট তৈরি করে দিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন কোন অজানায় সেই মানুষটাকে আর যাই হোক অন্তত শোক জানানো শোভন হবে না। কেননা ‘টেস্ট অব চেরি’র মত তার মহান এই সৃষ্টিকর্মগুলো যতোদিন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষকে ছুঁয়ে যাবে ততোদিন পর্যন্ত জীবনের আরেক নাম হয়ে থাকবেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। যিনি শুধু ইরানি সিনেমার নয়, বিশ্ব সিনেমার ওস্তাদ।

-বাংলামেইল২৪ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like