স্ত্রীর দাবি, মুছাকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি

coxsbazartimes.com-pic.2

চট্টগ্রাম ডেস্ক:  মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যার অন্যতম সন্দেহভাজন কামরুল শিকদার ওরফে মুছাকে ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন তাঁর স্ত্রী পান্না আক্তার। তিনি বলেন, ২২ জুন চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে মুছাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হত্যাকাণ্ডের আরেক সন্দেহভাজন নূর নবীও ডিবি পরিচয়ধারী লোকগুলোর সঙ্গে ছিলেন।

মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে এসব কথা বলেন। ঘটনার পর থেকে মুছার পরিবার তাঁদের চট্টগ্রাম শহরের বাসায় অবস্থান করছে না।

এদিকে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদাকে হত্যার পর ঘটনাস্থলে পাওয়া গুলির খোসার বিস্ফোরক (ব্যালিস্টিক) পরীক্ষার জন্য গতকাল চট্টগ্রাম সিআইডির কাছে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার এহতেশামুল হক ওরফে ভোলার কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র থেকেই এই গুলি ছোড়া হয়েছিল কি না, তা ব্যালিস্টিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ওই হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার দুজন আনোয়ার হোসেন ও ওয়াসিম তাঁদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, মাহমুদা খানম হত্যার পুরো বিষয়টির সমন্বয় করেছিলেন মুছা। আর মাহমুদাকে পেছন থেকে ছুরি মারেন নবী। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মুছার বাসায় সবাই আলোচনায় বসেছিলেন। তবে গতকাল মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেন, মাহমুদা হত্যার আগের দিন তাঁদের বাসায় কেউ আসেনি।

পুলিশ বলছে, মুছা ও নূর নবী তাদের হেফাজতে নেই। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। মুছাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, মুছা পুলিশি হেফাজতে নেই। তাঁকে হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজছে। ডিবি পুলিশ তাঁকে কখনো আটক করেনি কিংবা হেফাজতে নেয়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, মুছাসহ পাঁচ আসামিকে পুলিশ খুঁজছে। অন্য চারজন হলেন মো. কালু (২৮), মো. রাশেদ (২৯), নূর নবী (২৮) ও শাহজাহান (২৯)। তাঁদের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়। জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির গতকাল বিকেলে বলেন, মাহমুদা হত্যা মামলার পলাতক পাঁচ আসামির গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া হলেও তাঁরা এখানে নেই। তাঁদের খোঁজা হচ্ছে।

পান্না আক্তার বলেন, ২২ জুন ডিবির একটি দল বন্দর এলাকার ওই আত্মীয়ের বাসায় নূর নবীকে নিয়ে আসে। পান্নার সামনেই তারা মুছাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর আট দিন হয়ে গেলেও মুছার কোনো খোঁজ মিলছে না। তিনি বলেন, চারপাশে যে রকম কথাবার্তা চলছে, তাতে তিনি মুছার প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে পান্না বলেন, ‘আমার স্বামী দোষী হলে আইনের মধ্যে বিচার হোক। গুম করা হলো কেন?’
স্বামীর খোঁজ না মেলায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন কি না জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, পুলিশ তাঁর স্বামীকে আদালতে চালান দেবে ভেবেছিলেন। যে কারণে জিডি করেননি। এখন বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকেন তিনি। ভয়ে বাইরে বের হন না। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী বালুর ব্যবসা করেন। পাশাপাশি ‘প্রশাসনের কাজ’ও করতেন। কী কাজ করতেন জানতে চাইলে পান্না বলেন, ‘মুছা র্যা ব ও ডিবির সোর্স।’

৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন মাহমুদা। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর স্বামী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এই মামলার আসামি ওয়াসিম, আনোয়ার, অস্ত্র সরবরাহকারী ভোলা ও তাঁর সহযোগী মনিরকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী এখনো পলাতক রয়েছেন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া মুছাসহ পাঁচ আসামি।

পুলিশ সূত্র জানায়, মুছার গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ঠান্ডাছড়ির মধ্যম ঘাগড়া গ্রামে। ওই এলাকার মৃত শাহ আলম শিকদারের ছেলে তিনি। পরিবার নিয়ে তিনি নগরের বাকলিয়ার রাজাখালী এলাকায় থাকতেন। বাসাটি বর্তমানে তালাবদ্ধ রয়েছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, সৌদি আরবে প্রবাসজীবন শেষে ২০০০ সালে দেশে ফিরে আসেন মুছা। ২০০৩ সাল থেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন। মুছার বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ চৌধুরী হত্যাসহ আটটি মামলা রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলি সিআইডির পরীক্ষাগারে: মাহমুদা হত্যার ঘটনাস্থল জিইসি এলাকা থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা একটি গুলির খোসা ও তিনটি পিস্তলের গুলি উদ্ধার করেন। পরে এগুলো তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রাখা হয়। গুলির বিস্ফোরক (ব্যালিস্টিক) পরীক্ষার জন্য তা গতকাল সিআইডির চট্টগ্রাম কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, মাহমুদা হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত একটি পিস্তল, রিভলবার, ছয়টি গুলিসহ অস্ত্র সরবরাহকারী এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা এবং তাঁর সহযোগী মনিরকে গত সোমবার বাকলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভোলা স্বীকার করেছেন, মাহমুদা হত্যায় ব্যবহারের জন্য মুছাকে অস্ত্র দিয়েছেন তিনি। তা ছাড়া এই মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ভোলা অস্ত্র সরবরাহ করেছেন বলে আদালতকে জানান। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির খোসা ভোলার কাছ থেকে উদ্ধার অস্ত্রের গুলি কি না, তার বিস্ফোরক পরীক্ষা করা হবে।

-প্রথম আলো

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like