লোকশিল্পের ভিত্তি মূলত ইসলামী চিত্রকলা

লাইফস্টাইল ডেস্ক : শিল্পের এক নীরব ও শক্তিশালী মাধ্যম চিত্রকলা। চিত্রকলার সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রায়োগিক ভাষা। কোনো প্রাণির মূর্তি নির্মান করা ইসলামী শরীয়তে হারাম বা গুনাহ। হাদীস শরীফে এ নিয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মুসলিম চিত্র শিল্পীরা তাই প্রাণির ছবি বর্জন করে অন্য উপায়ে সৌন্দর্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। ইসলামী চিত্রকলার এই পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যান্য চিত্রকলাকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া বাংলাদেশের লোকশিল্প গড়ে উঠেছে মূলত ইসলামী চিত্রকলাকে কেন্দ্র করেই।

১২০৫ সালে তুর্কি বংশোদ্ভুত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে শিলালিপিতে আরবি-ফারসি ক্যালিগ্রাফির যাত্রা শুরু হয়। সুলতানী ও মুঘল আমলে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, মাজার, কবরস্থান, প্রশাসনিক ইমারতে বিভিন্ন শিলালিপি স্থাপন করা হয়েছে। এ সকল নকশাচিত্রে কুরআন হাদীসের বাণী, সমকালীন বিষয়, স্থাপনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে সে সময়কার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কে ধারনা করা যায়।

হাজার বছর ধরে গ্রাম বাংলার লোকেরা তাদের ধর্মীয় চেতনা, মনের রঙ আর হৃদয়ের স্পর্শ দিয়ে গড়ে তুলেছে এদেশের লোকশিল্প। এ শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য সারল্য। বাংলাদেশের এ লোকশিল্প মূলত ধর্মীয় চেতনা থেকে উদ্ভুত।

নবান্নের উৎসবে মুসলিম মেয়েরা ফুল লতাপাতা দিয়ে জ্যামিতিক নকশা আঁকে। তারা বাঁশের বেত দিয়ে চালন-ডালা বানিয়ে তার মধ্যে আরবি ক্যালিগ্রাফী করেন। সেখানে নানা বর্ণের বেত দিয়ে আল্লাহ আর নবীজীর নাম লিখে ভক্তি ভরে ঘরে টাঙিয়ে রাখেন। হোটেলের দেয়ালের তিন-চারফুট জায়গা জুড়ে বিশাল সমুদ্র এঁকে তার মাঝখানে আরবি ক্যালিগ্রাফীর মাধ্যমে আল্লাহু লিখে পাল আঁকে। মোহাম্মদ লিখে নৌকা ও দাড় আঁকে। এসব শিল্প নৈপূন্য ধর্মীয় চিত্র সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমনকি লঞ্চের গায়ে ও রিকশার পেছনদিকে যেসব ছবি আঁকা হয় তার বেশিরভাগ বিষয়বস্তুই ইসলামী। অনেকে শোবার ঘরে আরবি ক্যালগ্রাফীর মাধ্যমে বিভিন্ন রঙ দিয়ে আল্লাহ ও রাসূলের নাম লিখে শিল্পকলার পরিচয় ফুটিয়ে তোলেন।

নকশী কাঁথা, বালিশের কাভার, জায়নামাজ, দস্তরখানা, কোরআন শরীফের গিলাফ ইত্যাদিতে দেখা যায় চমৎকার সূচিকর্মের নিদর্শন। কখনো পুষ্পলতা, কখনো জালি দিয়ে ডিজাইন করে মনের আবেগ প্রকাশ করা জ্যামিতিক নকশার এইসব ডিজাইন ইসলামী শিল্পকলার পরিচয় বহন করে। জায়নামাজে আঁকা ইসলামী স্থাপত্যের নিদর্শন, মিনার, গম্বুজ, মসজিদ এবং মসজিদের মেহরাব অঙ্কনেও ইসলামী শিল্পের পরিচয় পাওয়া যায়। মেহরাবের তিনপাশেই প্লাষ্টিক দিয়ে তরঙ্গায়িত পদ্ম-লতা ও জ্যামিতিক ত্রিভুজ পর পর সাজিয়ে রাখা হয়। কোনো কোনো মেহরাবে রঙিন ক্যাফিগ্রাফিতে কলমা শরীফও অঙ্কিত থাকে।

পাখা, নকশী পাটি, নকশী শিকা, চালন, কুলা ইত্যাদিতে ফুল, লতা, পাতা, চাঁদ আর আরবি ক্যালিগ্রাফী ফুটিয়ে তুলতে দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, পিঠা শিল্পও ইসলামী শিল্পের পরিচয় বহন করে। আবহমান কাল থেকে মুসলিম মেয়েরা মেহেদি পাতার রস দিয়ে হাত পা রঙিন করেন। বিয়েতে মেহেদী অপরিহার্য। তবে ঈদের আগের দিন মেহেদি লাগানোর এই চল বহু আগে থেকেই চলে আসছে। ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা জ্যামিতিক, কোনাকুনি নকশায়সহ বিভিন্ন নকশায় হাতে মেহেদি লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

আমাদের লোকশিল্পে মূলত আবহমান বাংলার সাধারন মানুষের সৌন্দর্য জ্ঞানের অম্লান পরিচয় ফুটে উঠে। সেই শিল্পজ্ঞান প্রধানত ইসলামী শিল্পবোধ থেকেই উদ্ভুত।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like