পারিবারিক দ্বন্দ্বে মায়ের অবিশ্বাস্য নির্মমতা!

Child2016041904062120160419195243

দেশ ডেস্ক :   শিশু নিহাল সাদিকের বয়স মাত্র দেড় বছর। প্রতিদিন সকালে ছেলেকে আদর করে, চুমু খেয়ে কাজে বের হতেন বাবা সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন মুরাদ। রাতে বাসায় ফিরেও ছেলের মুখ দেখেই যেনো সব ক্লান্তি ভুলে যেতেন তিনি।

তবে সোমবারের (১৮ এপ্রিল) রাত ছিল সাজ্জাদের জীবনে একটি দুর্বিষহ দিন।

সেদিন সকালেও ফুটফুটে নিষ্পাপ সন্তান নিহাল ও তার মা ফাহমিদা মীর মুক্তিকে বাসায় রেখে কাজে গিয়েছিলেন উত্তরার নর্থ টাওয়ার শপিং মলের লেডিস কর্নার নামে একটি দোকানের সেলসম্যান সাজ্জাদ। কিন্তু বাসায় ফিরে যে দৃশ্য দেখলেন, তা যেন দুঃস্বপ্নকেও হার মানিয়েছে। কাজ শেষে বাসায় ফিরে বাবা দেখলেন সন্তানের মরদেহ। পাশেই শুয়ে ছিলেন মা মুক্তি।

সোমবার রাতে মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর উত্তরখানের মাস্টারপাড়া সোসাইটি রোডের ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ির চতুর্থ তলায়। প্রায় দুই বছর ধরে ওই বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকেন সাজ্জাদ। এ বাসায় থাকাকালেই জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান নিহাল সাদিক।

পুলিশের ধারণা, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের জের ধরে ঘুমন্ত শিশুকে খুন করেছেন তারই মা মুক্তি। ছেলেকে খুন করে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। সোমবার মধ্যরাতে পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে প্রথমে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। পরে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শিশুটির বাবা সাজ্জাদ হোসেন মুরাদও মনে করছেন, স্ত্রী মুক্তিই সন্তানের ঘাতক। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার সন্তান খুব সুন্দর করে হাসতো। নিহালের হাসি আমার মন কেড়ে নিতো। কাজ শেষে বাসায় ফেরার জন্য ছুটতাম। ওর এক হাসি দেখলেই আমার সব ক্লান্তি কেটে যেতো’।

‘কিন্তু সোমবার রাত সাড়ে দশটায় বাসায় ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে আমার সন্তানকে কোলে নিতে যাই। গায়ের ওপর থেকে কাঁথা সরানো মাত্রই দেখি, বিভৎস অবস্থায় পড়ে আছে আমার সন্তান। এই দৃশ্য কখনো কল্পনাও করিনি’ -বলেই কেঁদে ফেলেন বাবা সাজ্জাদ।

উত্তরখান থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) শেখ সিরাজুল হক বাংলানিউজকে বলেন, শিশুটিকে তার মা হত্যা করেছেন- এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করা করেছেন। পুলিশের হেফাজতে তার চিকিৎসা চলছে। সুস্থ হলেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে ওসি আরও জানান, পারিবারিক কলহের জেরে শিশুটিকে তার মা হত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। শিশুটির মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে শিশুটির বাবা সাজ্জাদ উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

সাজ্জাদ বলেন, ‘মুক্তি ধূমপান করতো। অনেক বার মানা করেছি, বুঝিয়েছি, তবুও শোনেনি। আমি বলেছি, তুমি ধূমপান করো না। কারণ, আমার সন্তান বুকের দুধ পান করে। তোমার শরীরের নিকোটিন আমার সন্তানের শরীরে যায়। আমার সন্তানের শরীরে নেশা প্রবেশ করুক, এটা বাবা হয়ে আমি চাই না। এমনকি আমার সন্তানের সামনেই ধূমপান করতো মুক্তি’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ বছর। মুক্তির এমন আচরণের কারণে আমি আমার সন্তানকে আলাদা নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু ও দেয়নি। কারণ, এ পরিবেশ আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। সে বলতো, আমি সন্তানকে দেবো না। তোকে মারবো, সন্তানকেও মেরে ফেলবো, কিন্তু নিয়ে যেতে দেবো না’।

‘কিন্তু সন্তানকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করেছে মুক্তি! আমার সন্তানের কি দোষ ছিলো? খুন করলে আমাকেই করতো, আমার সন্তানকে কেনো?’- বললেন সন্তানহারা এই বাবা।

‘যদি মায়ের কোলে তার শিশু নিরাপদ না থাকে, তবে আমি মনে করি, কোনো নারীরই ‘মা’ হওয়ার দরকার নেই’ –বলতে বলতে কাঁদতে থাকেন বাবা সাজ্জাদ।

অন্যদিকে মানসিকভাবে অসংলগ্ন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিহত শিশু নিহালের মা ফাহমিদা মীর মুক্তি চিকিৎসকদের বলেছেন, ‘তার সন্তানকে কোনো এক নারী হত্যা করেছে। তবে কে তাকে তিনি চেনেন না’।

চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে আলাপ করতে গেলে বাংলানিউজকেও মুক্তি বলেন, ‘কোনো এক অচেনা নারী তার সন্তানকে হত্যা করেছে। তিনিও বুঝতে পারছেন না, কে ওই নারী’।

তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে মুক্তিকে মানসিক বিভাগে স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজ্জাদ ও মুক্তির বিয়ের বয়স সাড়ে ৪ বছর। তবে এর আগে এই দম্পতির উভয়েরই বিয়ে হয়েছিলো। মুক্তির আগের সংসারে সাদিয়া নামের ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে সন্তানও রয়েছে। পরিবারে প্রায় সময় কলহ লেগেই থাকতো। তাদের এই কলহের মূলেই ছিলো একে অপরের প্রতি সন্দেহ।

সাজ্জাদের পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী নাজনীন আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, ‘মুক্তি এমন কাজ করতে পারেন, তা কখনোই ভাবিনি। তাকে নিজের ছোট বোনের মতো দেখতাম। পরিবারের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আমার সঙ্গে তার কথা হতো। নিজের সন্তানকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। সেই সন্তানকে মুক্তি খুন করবেন, এটা বিশ্বাস করতে এখনো কষ্ট হচ্ছে’।

‘প্রায়ই সাজ্জাদ ও মুক্তির মধ্যে ঝগড়া হতো। আবার মিলেও যেতো। রাতে সাজ্জাদ জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিলে খুলতেই শুনি এমন খবর। ছুটে গিয়ে দেখি, রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। আঁতকে উঠেছি। মুক্তিকে বললাম ‘তুমি এ কি করলা? নিহালকে মেরে ফেললা?’ কিন্তু ওর মুখে কোনো জবাব ছিলো না। কিছুই বলেনি’।

-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like