হেফাজতে নির্যাতন: পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা চলবে

বিচার বিভাগীয় তদন্তে আসা সুপারিশের ভিত্তিতে দুই বছর আগে লক্ষ্মীপুরের দায়রা জজ আদালত মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিল। বাদীপক্ষের করা ‘রিভিশন’ আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ জজ আদালতের ওই আদেশ বাতিল ঘোষণা করেছে।

সেইসঙ্গে আইন অনুসারে এ মামলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেও বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন মো. ইকবাল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবীর ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল শহীদুল ইসলাম খান।

রায়ের পর ইকবাল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাই কোর্টের এই আদেশের ফলে তিন পুলিশ সদস্যসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মামলাটি চলতে আইনগত আর কোনো বাধা থাকল না।”

রামগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম সুমনকে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে তার বাবা শামসুন নূর পাটোয়ারি ২০১৪ সালের ১২ অগাস্ট নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের ১৩ ও ১৫(১) ধারায়  লক্ষ্মীপুরের দায়রা জজ আদালতে এই নালিশি মামলা করেন।

এতে রামগঞ্জ থানার ওসি লোকমান হোসেন, এসআই আবদুল মমিন ও শরীফুল ইসলাম এবং লুৎফুর রহমান ও মোজাম্মেল হোসেনকে আসামি করা হয়।

২০১১ সালের অস্ত্র আইনের এক মামলায় ২০১৪ সালের ৭ অগাস্ট সুমনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুমনের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও অস্ত্রসহ ১০টি মামলা রয়েছে  রামগঞ্জ থানায়। তিনি স্থানীয় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী।

মামলায় সুমনের বাবা অভিযোগ করেন, আটকের দিন সন্ধ্যায় তার ছেলেকে রামগঞ্জ থানার পুলিশ ব্যারাকের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়।

ওসি লোকমান নির্যাতনের এক পর্যায়ে সুমনের চোখে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে ‘তরল পদার্থ বের করে’ আনে। এতে তার চোখ নষ্ট হয়ে যায়।

শামসুন নূর পাটোয়ারি মামলা করার পর ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর দায়রা আদালত লক্ষ্মীপুরের ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচারিক তদন্তের দায়িত্ব দেয়।

ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২০১৫ সালের ৫ অগাস্ট দায়রা আদালতে যে প্রতিবেদন দেন, তাতে বলা হয়, “সার্বিক অনুসন্ধানে, অভিযোগকারী পক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার ঘটনা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হয় না।”

এরপর ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর দায়রা জজ আদালত তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে অভিযোগ খারিজ করে দেয়।

ওই আদেশের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ ২০১৫ সালে হাই কোর্টে রিভিশন আবেদন করে। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট রুল দেয়।

দায়রা জজ আদালতের মামলা খারিজের আদেশ কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। চূড়ান্ত শুনানি শেষে মঙ্গলবার হাই কোর্ট রুল ‘যথাযথ’ ঘোষণা করে রায় দিল।

আবেদনকারীর আইনজীবী ইকবাল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করলে দায়রা জজ বাদীকে পরীক্ষা করবে। পরীক্ষায় যদি তিনি মনে করেন যে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে, তাহলে অভিযোগ আমলে নেবেন এবং ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা করানোর আদেশ দেবে।

ওই আইনের ৪ ও ৫ ধারা অনুসারে এক্ষেত্রে বিচারিক তদন্তেরও কোনো বিধান নেই বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।

“বিচারিক তদন্তের প্রতিবেদন ছয়জন সাক্ষী বিস্তারিতভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। ওই বর্ণনার ভিত্তিতে বাদীর আনা অভিযোগের সতত্যা মেলে। তাই বিচারিক আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে  অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার শুরুর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দায়রা জজ আদালতের বিচারক তদন্তকে বিচারিক মনে (জুডিশিয়াল মাইন্ড) না নিয়ে মামলাটি খারিজ করে দেন, যা আইনসিদ্ধ নয় বলে রিভিশন আবেদনটি করা হয়।”

-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like