প্রণয়নেই ত্রুটি থাকে আইনে: প্রধান বিচারপতি

এজন্য আইনপ্রণেতাদের অজ্ঞতাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ওই আইন বিচার বিভাগে চাপ তৈরি করছে এবং দুর্ভোগে ফেলছে বিচারপ্রার্থীদের।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের আইন সংস্কার নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রচলিত আইনের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলেন প্রধান বিচারপতি।

বাংলাদেশে প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ আইনের অধিকাংশই ১৮৯৮ সালের উল্লেখ করে বিচারপতি সিনহা বলেন, “দেখা যায়, প্রয়োগিকভাবে এই আইনগুলোতে খুব কম কার্যকারিতা আসে।”

এই প্রসঙ্গে কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর আলোচিত হত্যাকাণ্ডও আসে প্রধান বিচারপতির কথায়।

“এই যে কুমিল্লাতে যে ঘটনা ঘটেছে, এটা একেবারে সাইন্টিফিক মর্ডান ওয়ে’তে। এতে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে… ইনভেস্টিগেশন করা হবে। এটাকে করতে হলে নতুন ডিজিটালাইজড ওয়েতে বা নতুন পন্থায় ইনভেস্টিগেশন চিন্তাভাবনা করতে হবে।”

প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, “দেশটা কিন্তু আজকে একটা পরিপত্র কালকে একটা পরিপত্র এইগুলো দিয়ে দেশটা চলছে। এইসব পরিপত্র আইন হিসেবে চালিয়ে দিই।

“এতে কিন্তু বেশ কিছু বৈষম্য হয়ে যায় । এর পরিপ্রেক্ষিতে হাজার হাজার মামলা পড়ে থাকে। এই মামলাগুলো নিয়ে আমরা হিমশিম খেয়ে যাই।”

আইন সংস্কারের উপর জোর দেওয়ার পর  নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও দুর্বলতার দিকটি চিহ্নিত করেন প্রধান বিচারপতি।

“যে বিষয়ের উপর আইন করা হল, সেই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় না। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হল যে আমরা যখন পার্লামেন্টারি ডিবেট নিয়ে আসি, আইনের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা জন্য। আমরা কি কিছু পাই? আমাদের আইন প্রণেতাদের আইন সম্বন্ধে অজ্ঞতা আছে।”

“আলোচনা- বিতর্ক না থাকায় প্রত্যেকটা আইন ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্য আইনগুলোর উপর রিফলেক্ট ঘটে। ফলে জনগণ ভোগান্তিতে পড়ে, বিচার বিভাগে চাপ পড়ে।”

‘বিচার বিভাগ ফেরেশতা নয়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এই অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবুল বারকাতের করা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতি বলেন, অন্য সব স্থানের মতো বিচার বিভাগেও কিছু অনিয়ম রয়েছে।

অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে অধ্যাপক বারকাত বলেন, “লোয়ার কোর্ট থেকে শুরু করে হাই কোর্ট পর্যন্ত আইন-রায় বেচে খাই।”

জবাবে বিচারপতি সিনহা বলেন, “উনাকে আমি প্রশ্ন করছি, আপনি একটা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। আপনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, আপনি যেগুলো লোন দিয়েছেন, সেগুলো ন্যায়মতো দিয়েছেন। আপনি পারেন নাই, আপনাকে কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে। উপায় নেই, আপনাকে বাধ্য হতে হয়েছে।”

এক মেয়াদে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারকাত প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে গেলে বিচারপতি সিনহা বলেন, “আই নো… আমি জানি, একটাতে আপনাকে বাধ্য হতে হয়েছে।”

সর্বত্র দুর্নীতির প্রভাব থেকে বিচার বিভাগ বিচ্ছিন্ন নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সব জায়গায় অনিয়ম থাকবে, বিচার বিভাগের একবারেই ফেরেশতা হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। হয়, কিছু অনিয়ম হয়।

“এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও কিছু ইনস্টিটিউশনকে আরও জবাবদিহিতা করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে আইন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক এম শাহ আলম রচিত ‘বাংলাদেশের আইনের সংস্কার ও আইন কমিশন’র পাশাপাশি ‘সিলেক্টেড রাইটিং অন ইন্টারন্যাশনাল কনস্টিটিউশনাল ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, আইন বিভাগের অধ্যাপক রহমতউল্লাহ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালেয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক সরকার আলী আক্কাস প্রমুখ।

-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like