অভিশপ্ত তিনটি বল!

ক্রিকেটে মাঝে মাঝেই এমন কিছু ব্যাপার ঘটে যায়, যেগুলোর ব্যখ্যা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের শেষ তিনটি বলের মূল ব্যখ্যাও এটিই, কোনো ব্যখ্যা নেই!

কোন যুক্তিতে এটি ব্যাখ্যা করা যায়? ফেলা যায় কোন ছাঁচে? ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারও বলা যেতে পারে। কিন্তু অবিশ্বাসের রেশ থেকে যায় তার পরও।

মাহমুদউল্লাহর কথাই ধরা যাক। গত কিছু দিনের পারফরম্যান্সে টি-টোয়েন্টিতে শুধু বাংলাদেশের নয়, হয়ত বিশ্ব ক্রিকেটেরই সেরা ‘ফিনিশার’। ফর্ম দুর্দান্ত, টেম্পারামেন্ট তো তার বরাবরই দারুণ। যে কোনো পরিস্থিতিতে শান্ত, স্থিতধী থাকতে পারার ক্ষমতা সহজাত। এই ম্যাচে যে পরিস্থিতি ছিল, সেটির জন্য হয়ত সবচেয়ে আদর্শ ব্যাটসম্যান।

ওই পরিস্থিতিতে নিজেদের একজন ব্যাটসম্যানকে বেছে নিতে বললে বাংলাদেশ দল নি:সন্দেহে মাহমুদউল্লাহকেই বেছে নিত। সেই তিনিই ওই সময়ে হার্দিক পান্ডিয়ার ফুল টস বলকে ফিল্ডারের হাতে তুলে দেবেন, কে ভাবতে পেরেছিল!

মহেন্দ্র সিং ধোনি ম্যাচ শেষে বলেছেন, অনেক সময়ই ব্যাটসম্যানদের এরকম হয়। জয় নাগলে থাকলে শট খেলে ম্যাচ শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে। সোজা ভাষায় বলা যায়, নায়কোচিত কিছু করা। কিন্তু এই ব্যাপারও তো মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে যায় না!

নায়ক হবার তাড়না তার মাঝে কবেই বা দেখা গেছে! ক্যারিয়ার জুড়েই আড়ালে থেকে করে গেছেন নিজের কাজ। পাদপ্রদীপের আলোকে উপেক্ষা করে গড়ে নিয়েছেন নিজের আলোর ভুবন।

এই ম্যাচেও তো দেখা গেছে আপন রূপের মাহমুদউল্লাহকে। প্রবল চাপেও ভড়কে না গিয়ে আগলে রেখেছিলেন ইনিংস, টেনে নিচ্ছিলেন দলকে। সৌম্য সরকারের আউটে দল যখন চাপে, পরের বলেই একদম ঠাণ্ডা মাথায় এমন একটি বাউন্ডারি মারলেন, যা পুরো ম্যাচেরই সম্ভবত সবচেয়ে দৃষ্টিননন্দন শট। চেহারায় ফুটে উঠছিল প্রতিজ্ঞা।

সেই মাহমুদউল্লাহ হঠাৎ কেন চোখধাঁধানো কিছুর পেছনে ছুটবেন? কেন এই দিনটিতেই এমন পরিস্থিতিতে দেখাতে চাইবেন বীরদর্প! বিশেষ করে আগের বলেই যখন দেখলেন, আরেক প্রান্তে আত্মহত্যা করেছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। তার পর তো আরও সতর্ক, সাবধানী হয়ে যাওয়ার কথা মাহমুদউল্লাহর। কেন হতে পারেন নি, সেটার ব্যখ্যা নেই। ব্যখ্যা হয় না!

কিংবা মুশফিক! শেষ ওভারে টানা দুটি চার মারলেন, দুলতে থাকা পেন্ডুলাম স্থির করলেন বাংলাদেশের পাশে। একটি রান নিলেই স্কোর থাকত সমতায়, শেষ দুই বলের জন্য ফিল্ডার চাপিয়ে আনতে বাধ্য হতেন ধোনি। শেষ দুই বলে তখন বাউন্ডারির সুযোগ আরও ভালো থাকত। মৌলিক এই ভাবনা মুশফিকের মাথায় না আসার কারণ নেই। লং অন থেকে মিড উইকেট পর্যন্ত সীমানায় তিনজন ফিল্ডার রেখে পান্ডিয়া যে শর্ট বা স্লোয়ার শট বল করতে পারেন, এটাও মুশফিকের না বোঝার কারণ নেই। তবু ওই শট খেলে ফেলেছেন। কেন? উত্তর মেলা ভার। নিশ্চিত, তিনি নিজেও হিসাব মেলাতে পারছেন না।

দুজনে মিলে খেলেছেন ৪৬৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এত এত বছরের অভিজ্ঞতা। ওই মুহূর্তের সামান্য করণীয়টা না বোঝার কারণ নেই। ধারাভাষ্যকার-বিশ্লেষকরা বলেছেন, সিঙ্গেল নিয়ে খেললেই হতো। ম্যাচ শেষে অধিনায়কও বলেছেন একই কথা। কোটি ক্রিকেট ভক্ত, আমজনতা সবাই বলছেন সিঙ্গেল নিলেই হতো। মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ সেটা বোঝেননি? অবশ্যই বুঝতেন। কিন্তু ওই মুহূর্তটিতে দুজনই আসলে পা দিয়েছিলেন সময়ের ফাঁদে। সেই ব্যখ্যাতীত সময়!

ওই শট দুটি দেখে বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি দর্শক যখন প্রশ্ন করছেন, ‘কেন খেলতে গেলেন তারা অমন দুটি শট’, তারা দুজনও কিন্তু তখন এমন কথাই ভাবছেন! মুশফিক যখন আউট হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরছেন বা মাঠেই হাঁটুতে ভর দিয়ে উবু হয়ে দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ, দুজনই কিন্তু ভাবছেন, ‘কেন এই শট খেলতে গেলাম!’ ক্রিকেট এভাবেই মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ব্যখ্যার সীমানা।

কিংবা মুস্তাফিজুর রহমান; শেষ বলে এরকম পরিস্থিতিতে নন স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যান সবসময়ই বোলারের সঙ্গেই ২২ গজের প্রায় অর্ধেক ছুটে চলে যায়। মুস্তাফিজের ওইটুকু বোধ অবশ্যই আছে। কিন্তু রানের জন্য ছুটতে মুহূর্তখানেকের জন্য দেরি হলো তার। কি ব্যখ্যা দেওয়া যায়?

অফ স্টাম্পের বাইরে পান্ডিয়ার ওই শর্ট বলে হয়ত ১০ বারের ৬-৭ বারই চার মারবেন শুভাগত হোম। এদিন পারলেন না বলে ব্যাট ছোঁয়াতেই।

মনস্তাত্ত্বিক খেলার কথা বলা যায়। ভারত অধিনায়ক ধোনি শেষ মুহূর্তগুলোয় অনেকটা সময় নিয়েছেন প্রতিটি বলের আগে। চাপের মাঝেও ছিলেন শান্ত। মাঠ সাজানো, পরিকল্পনা যখন কাজে গেছে, সেসবও সফল বলতেই হবে। কিন্তু এসব যুক্তিকেও বড় করা কঠিন। শেষ পর্যন্ত পান্ডিয়ার বল দুটি তো ছিল একটি শর্ট বল, আরেকটি ফুল টস!

শেষ ওভারে দুটি চার হজম করে এবং আরও দুটি বাজে বল করেও নায়ক পান্ডিয়া। কিন্তু দারুণ খেলে নায়ক হওয়ার দোড়গোড়ায় ছিলেন যে দুজন, মুহূর্তের ভুলে তারা ডুবে হতাশার অতলে। ক্রিকেট কখনও কখনও এমনই। থিতু হয়ে যাওয়া মাইক গ্যাটিং নতুন বোলারকে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে ডোবান দলকে। ল্যান্স ক্লুজনার ও অ্যালান ডোনাল্ড পাগলাটে দৌড়ে ছুটে চলে যান ট্র্যাজেডির মঞ্চে। বিশ্বের সেরা ফিল্ডারদের একজন হার্শেল গিবস লোপ্পা ক্যাচ ফেলে দিয়ে শোনেন বিশ্বকাপ ফেলে দেওয়ার টিপ্পনি। ব্যখ্যাতীত এসব ঘটনা আছে ক্রিকেট ইতিহাসের পরতে পরতে।

ভারত ম্যাচের ইতিবাচকতাও কিন্তু কম নেই। বাংলাদেশের লড়াই ছিল দু:সময়ের সঙ্গে। বাংলাদেশের লড়াই ছিল প্রবল প্রতিপত্তির ভারতের বিপক্ষে। জিততে পারলে সেটি হতো রূপকথা। কিন্তু এই পারিপার্শ্বিকতায় জয়ের অবস্থা সৃষ্টি করাটাও কি কম কথা!

বাংলাদেশের ওয়ানডে দল দাঁড়িয়ে গেছে। এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জানিয়ে দিল, নানা সীমাবদ্ধতার পরও টি-টোয়েন্টি দলটিও মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে। এভাবে ম্যাচ হারার কষ্ট হয়ত এসব ভাবনায় কমবে না, এমন হারের সান্ত্বনার প্রলেপও এটি নয়, তবে কিছু প্রাপ্তি তো বটেই!

অধিনায়কের মতো সবারই চাওয়া, হৃদয় মোচড়ানো তিন বলের বিভীষিকা হোক ভবিষ্যতের শিক্ষা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর এমন লড়াই, দু:সময়কে পাল্টা জবাব দেওয়ার দু:সাহস থেকেই আসুক ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা।

-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like