তনু হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ সর্বত্র, ‘তদন্তের স্বার্থে’ চুপ পুলিশ

tonu+comilla

কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার ভেতরে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চললেও খুনি কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। ‘তদন্তের স্বার্থে’ কিছু বলতেও চাচ্ছে না পুলিশ।

বুধবার কুমিল্লার পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় নানা সংগঠন যেমন কর্মসূচি পালন করেছে; তেমনি ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে সমালোচনার ঝড়।

তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। তবে তিন দিন গড়িয়ে গেলেও কোনো খুনি শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তারের খবর পুলিশ জানাতে পারেনি।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচনে পুলিশ তৎপরতা চালাচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখন অনেক কিছু বলা যাচ্ছে না।”

তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে তিনি জানান।

রোববার রাতে ময়নামতি সেনানিবাসের অলিপুর এলাকায় একটি কালভার্টের কাছ থেকে তনুর (১৯) লাশ পাওয়ার পর পুলিশ আলামত দেখে বলেছিল, এই তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

অলিপুর কালো পানির ট্যাঙ্কির রাস্তায় তনুর ব্যবহৃত জুতা, ছেঁড়া চুল, ছেঁড়া ওড়না পাওয়া গিয়েছিল। রাস্তার পাশে ঝোঁপের মধ্যে তার মাথা থেঁতলানো লাশ পাওয়া যায়।

সোমবার দুপুরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত হয়। এরপর তাকে গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরে দাফন করা হয়।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তনু কলেজ থিয়েটারের সদস্য ছিলেন। অলিপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি।

তনুর সতীর্থ মাইনুল হক স্বপন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার বন্ধু টিউশনি করতেন। ছাত্রের বাসা থেকে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বেরিয়েছিলেন তনু।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার দাবি

তনু হত্যাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার দাবি করে কুমিল্লায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীরা বুধবার দুপুরে কোটবাড়ি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপর টায়ারে আগুন দিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে।

খুনিদের ধরতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে কর্মসূচি শেষ করে তারা।

ঢাকার শাহবাগে বিকালে গণজাগরণ মঞ্চ মিছিল-সমাবেশ করে তনু হত্যার বিচার দাবি করেছে। মানববন্ধন করেছে ছাত্র ইউনিয়ন।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় তনু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

সরব সোস্যাল মিডিয়া

ফেইসবুক, টুইটার ও ব্লগসহ  ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগের নানা ওয়েবসাইটে চলছে তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা।

খুনিদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনের ‘নির্লিপ্ততার’ সমালোচনার পাশাপাশি সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকায় এভাবে হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নও ‍তুলেছেন কেউ কেউ।

ফেইসবুকে জিয়া হাসান নামে একজন লিখেন, “তনু হত্যার বিচার চাই। হিজাবী তনু নয়, আবৃত্তি শিল্পী তনু নয়, ক্যান্টনমেন্টে মৃত তনু নয়, নাগরিক তনু হত্যার বিচার চাই। এই ঘটনা যেন আর না ঘটে তাই, অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”

‘উই আর তনু’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে তনুর নামে করা ‘ভার্চুয়াল প্ল্যাকার্ড’ শেয়ার করে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুতি আমাদের বোন তনুর হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে অবিলম্বেই ফাঁসিতে ঝুলানো হউক..”

টুইটারে ‘ডানপিটে’ লিখেছেন, “আজ তনুকে মারলো, আরেক দিন আমার বোনকে মারবে। তারপর তোমার বোনকে মারবে। আর কত জনের মায়ের বুক খালি করবে ওরা।”

নুসরাত জাহান হিমু নিজের ফেইসবুক ওয়ালে এক ভিডিও বার্তায় ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দোষীরা যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায় সেজন্য সাবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তনু হত্যার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাকার্ডও ঘুরছে। তনুর মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা তার বাবার একটি কথাও রয়েছে কার্ডে।

“তুমি কান্দ কেরে? তুমি কি দেখছ? আমি এই হাত দুইডা দিয়া আমার তাজা মাইয়াডার লাশ ধরছি। আমার তিগা তোমার বেশি কষ্ট?”

সাবিহা সোভা মোহনা তার ওয়ালে তনুর ছবি শেয়ার কলে লিখেছেন, “অভিশাপ দিচ্ছি- এই দেশ যেন রাজকন্যা শূন্য হয়ে যায়।”

“তনুকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু আমরা সবাই তনু হয়ে জ্বলে তো উঠতে পারি! এই ১৯ বছর বয়সী মেয়েটির জন্য, এমন অনেক তনুর জন্য, আমাদের নিজেদের জন্য, অন্তত একবার পথে নামি…” এই আহ্বানও এসেছে ফেইসবুকে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like