লুই আই কানের মূল নকশা পাওয়া গেছে

Jatiyo_Sangshad_187624080

অবশেষে জাতীয় সংসদের  মূল নকশার সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচারাল আর্কাইভে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে মূল নকশা শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ স্থপত্য অধিদফতরের একটি প্রতিনিধি দল।

এ নকশা আনতে আরো দুই-তিন মাস লেগে যাবে বলে জানা গেছে।

সোমবার (২১ মার্চ) বিকেলে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মূল নকশা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, হ্যাঁ, নকশা পাওয়া গেছে। নকশা আনার প্রক্রিয়া চলছে। সংসদ এলাকার সব নকশা পেতে আরো দুই তিন মাস সময় লাগতে পারে বলেও মন্ত্রী জানান।

এর আগে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী স্থপতি কাজী গোলাম নাসিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্র যান। সেখান থেকে তারাই নিশ্চিত করেন মূল নকশার বিষয়টি। এরপর মন্ত্রী গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।

স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির এর আগে বাংলানিউজকে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া ইউনির্ভাসিটির স্থাপত্য বিভাগ আমাদের কাছে শেরেবাংলা নগরের সকল নকশার তালিকা দিয়েছে। এতে দেখা গেছে, ৮ হাজারের বেশি নকশা রয়েছে। এখান থেকে যেটা প্রয়োজন সেটাও আনা যেতে পারে। আবার সরকার চাইলে সবগুলো নকশাই আনতে পারে।

লুই আই কানের এসব নকশা সংগ্রহ করতে নকশাপ্রতি খরচ হবে ৫০ ইউএস ডলার। এর সঙ্গে যারা আনতে যাবেন তাদের আসা-যাওয়া এবং থাকার খরচ তো রয়েছেই।

সংসদ ভবনের নকশা সংগ্রহের বিষয়টি অনুধাবন করে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লুই আই কানের মূল নকশা সংগ্রহের নির্দেশ দেন সংসদ সচিবালয়কে। সর্বশেষ গত বছরের ১৩ অক্টোবর একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী লুই আই কানের মূল নকশা আনার নির্দেশনা দেন। কেননা, মূল নকশা হাতে না থাকায় সচিবালয় সেগুনবাগিচা থেকে আগারগাঁও এ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছে না সরকার।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে লুই আই কান যখন মূল নকশাটি করেন, তখন ২৭টি মন্ত্রণালয়ের জন্য এ পরিকল্পনা করেন। তখন সেখানে মসজিদ ছিল, মাঝে বাগান ছিল, চন্দ্রিমা উদ্যানের স্থানে একটি বড় সড়ক ছিল, এর সামনে লেক ছিল, এরপর সংসদ ভবন ছিল। তাই অনুলিপি ধরে নয়, ১৯৭৪ সালের মূল নকশা ধরে সচিবালয়সহ সব কিছু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৪ সালে শেরেবাংলা নগরে ৪২ একর জায়গায় জাতীয় সচিবালয় নির্মাণের জন্য সরকার ও মার্কিন কোম্পানি ডেভিড উইসডম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে চুক্তি হয়। পরে এর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ওই এলাকায় এরই মধ্যে ১০ একর জমিতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। জমি কমে যাওয়া এবং বর্তমানের চাহিদা বিবেচনায় লুই আই কানের নকশা স্থাপত্য অধিদফতর কিছুটা সংশোধন করেছে।

নকশার ব্যাত্যয় ঘটিয়ে সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংসদ ভবন এলাকার ভেতরেই গড়ে তোলেন মাজার ও কবরস্থান। এর মধ্যে সংসদ ভবনের উত্তরে চন্দ্রিমা উদ্যানের মাঝখানে  ৭৪ একর জায়গা জুড়ে নিয়ে গড়ে তোলা হয় জিয়ার মাজার কমপ্লেক্স। আর জিয়া ও এরশাদের শাসনামল মিলিয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্ত লাগোয়া স্থানে পাঁচ বিঘারও বেশি জায়গাজুড়ে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে আরো অন্তত সাতজনকে সমাধিস্থ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গায় জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনেও বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ থাকবে। চারদিকে আটলেনের সড়ক, মাঝখানেও লেক। দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হবে সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বলয়।

লুই আই কানের নকশা ক্ষত-বিক্ষত করার প্রক্রিয়া এখানেই থেমে থাকেনি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ওই সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। লুই আই কানের নকশা উপেক্ষা করে আসাদ গেটের উল্টো দিকে সংসদ ভবনের জায়গায় একটি পেট্রোলপাম্প স্থাপনের জন্য তিনি তার ছোট ভাই মির্জা খোকনকে জায়গা বরাদ্দ দেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মাঝামাঝি সময়ে আরও এক দফা ক্ষত-বিক্ষত করা হয় লুই আই কানের মূল নকশা। ওই সময় সংসদ ভবনের মূল ভবনের পাশেই খোলা সবুজ চত্বরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ইন্সটিটিউট অব আর্কিটেক্ট (আইএবি) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) যৌথভাবে সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত অধিদফতরের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে। রায় আইএবি এবং বাপার পক্ষে গেলেও নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করেই নির্মাণ করা হয় স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন।

এদিকে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রাষ্ট্রপক্ষ। এ মামলার শুনানিতে গত বছরের ০৪ নভেম্বর স্থপতি লুই আই কানের তৈরি জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সের মূল নকশা তিনমাসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সে সময় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এ ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ সাধনার পর ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like