সে চূড়ায় রাতে থাকার কথা কেউ ভাবতে পারে না

হিন্দু-বৌদ্ধ উভয় ধর্মের উপাসনালয়গুলোর ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, সেগুলো অধিকাংশ পাহাড়-পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত। বিশেষ করে বৌদ্ধ মন্দিরগুলো। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ পার্বত্য এলাকাজুড়ে রয়েছে এমন বহু মন্দির। এবারের ভ্রমণ পরিকল্পনায় কোনো মন্দির না থাকলেও  লক্ষে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম পুরনো এক বৌদ্ধ মন্দির। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দক্ষিণে এক পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এই মন্দির। সচরাচর পথে না গিয়ে যেতে হয় কক্সবাজার হয়ে। ফলে বান্দরবানের বাসের পরিবর্তে ধরতে হল কক্সবাজারের বাস। নেমে পড়তে হবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া মহাসড়কের কোনো এক জায়গায়।

পরিকল্পনা তেমনই ছিল, ঢাকা থেকে সারা রাতের জার্নি শেষে নির্দিষ্ট জায়গায় নেমে পড়ার ত্রিশ মিনিট পূর্বে সহযাত্রীদের মাঝে থেকে কে যেন প্রস্তাব করে বসল, ভাড়া তো কক্সবাজারেরই দেয়া হয়েছে অতএব, সরাসরি সেখানে গিয়ে নামলে কেমন হয়? উত্তম প্রস্তাব, আগে তো ভেবে দেখা হয়নি। কক্সবাজারে গিয়ে এক দিন থেকে পরের দিন লক্ষের দিকে রওনা করা যেতে পারে।

কলাতলী মোড়ে সহযাত্রী সেরাজুল মোস্তাকিমের বন্ধু অবলিকিতেশ্বর চাকমা প্রস্তুত ছিল। উষ্ণ অভ্যর্থনার পর সে জানায়, ভালো দিনেই এসেছো, কাল বিশেষ একটি দিন। প্রকৃতিজুড়ে বয়ে যাচ্ছে রুক্ষ হাওয়া। বিচ্ছিরি রকমের ধুলায় ভীষণ বাজে পরিবেশ। সৈকত এলাকায় প্রচুর মানুষের সমাগম। এমন সময় কক্সবাজারে পর্যটকদের হুমড়ি খেয়ে পরার হেতুটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। রাতে থাকবার ব্যাবস্থা করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করায় পোহাতে হল এক বিরক্তিকর পেরেশানি। সন্ধ্যার পর ইজিবাইক ভাড়া করে মেরিন ড্রাইভ ধরে উপস্থিত হলাম হিমছড়ি। সেখানকার জনমানবহীন সৈকতে তাবু পাততে চাইলে উঠে আসে সম্ভাব্য নানা প্রতিকূলতার কথা- খাবার পানির মজুদ যথেষ্ট নয়, ভূতুড়ে নীরবতা, তাবু পাতার পর জোয়ারের সময় কি পরিস্থিতি দাঁড়াতে পারে ইত্যাদি। অনর্থক সব প্রচেষ্টায় কেটে গেল এক-দেড় ঘণ্টা। ভাট্টি ভাই তো বিরক্ত হয়ে বললেন, এই জায়গাটা সত্যি সত্যিই কুফা। ১২ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল।

এবারও ঠিক একই বিড়ম্বনায় পরতে হল। কলাতলী ফিরে সৈকতের দিকে এগিয়ে আলোকসজ্জা দেখে তো চোখ ধাঁধিয়ে উঠল। প্রতিটি হোটেল ঝলমল করছে হাজারও রঙ্গিন বাতির মিটমিটে আলোয়। বাজছে উচ্চ শব্দের বিদেশী গান। কোন কোন হোটেল থেকে আলোসজ্জার করিডোর এগিয়ে নেয়া হয়েছে সৈকতের কাছাকাছি। দিনটি ছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি। এবার বুঝলাম অবলিকিতেশ্বর চাকমার কথার শানে নযুল। ভ্রমণের উচ্ছ্বাস আর অবেগে ভুলেই গিয়েছিলাম কয়েক ঘণ্টা পর রাত বারোটা এক মিনিট থেকে শুরু হবে উন্মাদনা। ভ্যালেন্টাইন্স ডে! অথচ, এই ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে বিশেষ একটি দিন। ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’ (সাম্প্রদায়িক চেতনা, শিক্ষা বানিজ্যিকীকরণ ও শিক্ষা সংকোচন ভিত্তিতে প্রণীত)-এর বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের এই দিনটিতে ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলের ওপর তুলে দেয়া হয় চলন্ত ট্রাক। স্বৈরশাসকের পেটোয়া পুলিশ বাহিনীর উপুর্যপুরী গুলিতে লুটিয়ে পড়ে জাফর, জয়নাল ও শিশু দিপালী  সাহাসহ অনেকে।

পরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে সে আন্দোলন। পরের দিন ১৫ তারিখেও  তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। দুই দিনের হামলায় অকালে ঝড়ে পড়ে প্রায় পঞ্চাশটি তাজা প্রাণ। দুঃখের বিষয়, রক্তের অক্ষরে লেখা শহীদদের নাম আজ ভেসে গেছে ভ্যালেন্টাইন্সের জোয়ারে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য যারা প্রাণ দিল, তারা হারিয়ে গেল ভালোবাসা দিবসের ঝলমলে আয়োজনের তলে, অনেক দূরে। উন্মাদনায় গা না ভাসিয়ে আজ কি তরুণ-তরুণীরা হাত ধরাধরি করে প্রতিবাদের রাজপথে আসতে পারতো না? স্মরণ করতে পারতো না তাদের আত্মত্যাগের কথা? কি আর বলব, সহযাত্রীদের মাঝেও এসব যেন আটপৌড়ে বাক্য বিসর্জনের অধিক কিছু নয়। হাঁটতে থাকি সমুদ্রের পাশ দিয়ে। তাবু পাতার জন্য উপযুক্ত জায়গার খোঁজে। শেষ পর্যন্ত সুবিধা করতে না পেরে কোন একটি হোটেলেই রাত্রি যাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।

সামর্থের মধ্যে হোটেলের একটি কক্ষের সন্ধানে পেরিয়ে গেল দুই ঘণ্টারও অধিক সময়। ঘড়ির কাটা তখন রাত দশটা ছুঁইছুঁই। অনেক দর কষাকষির পর মাত্র পাঁচশ টাকায় মিলে গেল টিনসেড রেস্ট হাউজের একটি কক্ষ, যার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অবশ্য অবলিকিতেশ্বরের। কোন মতে রাতটা পার করতে পরার জন্য আমাদের মত পর্যটকদের নিকট তা ছিল যথেষ্ট। চারপাশের হোটেলগুলোতে রাতব্যাপী তাণ্ডব ডিজে পার্টির শব্দে ঘুমের রারোটা যে বাজবে তা আগেই আন্দাজ করা গিয়েছিল।

রাতের ঝামেলা অন্তে ক্লান্ত ও নীরব সৈকত পাড়া থেকে সকাল সকাল উঠে পড়ি পববর্তী গন্তব্যের গাড়িতে। দুই ঘণ্টা পর গাড়ি বদল করে উঠতে হল দ্বিতীয় গাড়িতে। পাহাড়ি পথের ফাল্গুনী সৌন্দর্য উপভোগ করার পরিস্থিতি আর কারও রইল না। রাতের ঘুম দিনে তাও আবার চলন্ত বাসে। চাইখ্যাং ইউনিয়নের নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ডে নেমে দেখি খাবার দোকান মাত্র একটি। বেলা তখন বারোটা। ডিম দিয়ে আলুঘাটি, সাথে আতপ চালের ভাত। ক্ষুধার্ত পেটের জন্য তা ছিল ভালোর উপর দিয়েও অনেক কিছু।

তার আগে রাস্তার ধারে পুকুরটায় নেমে প্রত্যেকেই আচ্ছামত ভিজে নিলাম। এবার চূড়ান্ত লক্ষের উদ্দেশ্যে ট্রেকিং শুরু। বাঙালি বসতি পেড়িয়ে ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছি মারমা অধ্যুষিত এলাকায়। মানুষগুলো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কৌতূহলে দু’এক জন এগিয়ে এসে জানতে চায়, কোথায় যাচ্ছি?

যখন বলা হল ঐ পাহাড় চূড়ায়। তখন বলল, ও মন্দির দেখতে? কিন্তু দেরি করে ফেলেছেন। ফিরে আসতে তো রাত হয়ে যাবে। তারা চায় না যে, বিকেলের পর সেখানে কেউ যাক। আর রাতে অবস্থানের কথা তো ভাবতেই পারে না। যদি কেউ সেখানে থাকার চিন্তা করে যেতে চায়; তাকে বাধা দেয়। বিষয়টি আমাদের অগে থেকেই জানা ছিল। তাদের বিশ্বাস প্রায় দেড় হাজার ফুট উচ্চতার ঐ পাহাড় চূড়ায় ভূত-প্রেত থাকে অনেক। সুতরাং, সামনে দিয়ে গিয়ে কেউ সেখানে বিপদে পরুক, এ তারা চায় না।

পথের সর্বশেষ মুড়ং পাড়ার পর মন্দিরের নাগাল পেতে বেজে গেল বিকেল পাঁচটা। অত্র এলাকার সব থেকে উঁচু পাহাড়। প্রত্যাশার চেয়ে পেয়ে গেলাম অধিক। ছাউনির নিচে বেদীর ওপর স্থাপিত প্রায় পনেরো ফুট উঁচু এক বুদ্ধমূর্তি। বাতাস বইছে সো সো করে। পূর্ব দিকে লিকলিকে মাতামুহুরী নদী। তার দুই পাড়ের সমতল ভূমি ঢাকা পড়েছে সবুজ ফসলের তুলতুলে অবরণে। মূর্তির পেছন দিকটায়; কিছুটা ফাঁকে আর একটি দ্বণ্ডায়মান মূর্তি। তা বোধহয় প্রয়াত কোন ভিক্ষু শ্রমনের হয়ে থাকবে। অদূরে তুলনামূলক উঁচু আর একটি চূড়া। গিয়ে দেখা গেল ভিত্তি স্থাপনের জন্য গর্ত করে রাখা । বোধহয় আর একটি মূর্তি বা মন্দির গৃহ নির্মাণ করা হবে। সূর্যের শেষ আলোয় চারপাশের সমস্ত পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাসন্তি বিকেলের মিষ্টি রং। পাখীরা ফিরে যাচ্ছে আপন নীড়ে। ঝিঝি পোকাদের সমস্বরী গান মৃদু থেকে জোড়ালো হচ্ছে। কমলা রং-এর পশ্চিম আকাশ, অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার পূর্বে আবিরের চাপা রেশ রেখে বিদায় নিচ্ছে। মুগ্ধ সঙ্গী সাথীগণ শেষ আলোটুকু থাকতেই তাবু পাতার কাজ সেরে নিল। ছয় সদস্যের দলে সম্বল মাত্র ১২ লিটার পানি আর পথে সংগ্রহ করা দুইটি বাঁধাকপি, এক কেজি পাকা টমেটো, কয়েকটা মরিচ ও মশলা মিক্স এবং গোটা ছয়েক নূডল প্যাক। ইয়াহিয়া, রিয়াদ এবং ভাট্টি লেগে পড়ল রাতের খাবার তৈরিতে। মশলা মাখানো কপি ও টমেটো ফালি ঝলসে নিয়ে নুডলসের সাথে খেতে ভালোই লাগল। রাত্রি গভীর হতে চললো। এক সময় বাঁকা চাঁদটির বিদায়ের সাথে সাথে দীঘল কালো আকাশের বুকে ফুটে বেরুল মিটিমিটি অজস্র তারা।

-রাইজিংবিডি

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like