বোলার মাশরাফিও অপরিহার্য

বুধবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন। ঘুরে ফিরে বারবারই আসছিল ম্যাচে মাশরাফির বোলিং আর ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়া ১৭তম ওভার।

এরকমই একটি প্রশ্নে মাশরাফি হাসলেন; মুচকি হাসি। মূলত বোলার হিসেবে খেলছেন, এরকম বোলিং করতেই পারেন। বারুদ যতোই পুরোনো হোক, আগুন জ্বলতেই পারে। ওই হাসির অর্থ হতে পারে অনেক কিছুই।

কণ্ঠে অবশ্য সেসব তুলে আনলেন না। একটু সময় নিয়ে বললেন, “দলের প্রয়োজনে এর চেয়েও ভালো বোলিং করতে পারব, সেই বিশ্বাস এখনও আছে।”

ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান, সংখ্যা নিয়ে মাশরাফি মাথা ঘামান সামান্যই। মাইক্রোফোন-রেকর্ডারের সামনে সেসব নিয়ে উচ্চবাচ্যও করেন না। নইলে অনায়াসেই বলতে পারতেন, অধিনায়ক মাশরাফি বল হাতেও নিজের কাজটা দারুণভাবে করে যাচ্ছেন নিয়মিতই। পাশাপাশি ব্যাট হাতেও টুকটাক অবদান রাখছেন।

যাক। সেদিনও ছিল বিশ্বকাপের ম্যাচ, অ্যাডিলেইডে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরনীয় জয়। মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম। মুশফিকুর রহিমের অসাধারণ ইনিংস (৭৭ বলে ৮৯)। রুবেল হোসেনের সেই খুনে দুটি ফুল লেংথ বল প্রায় সবার চোখে ভাসে।

ওই ম্যাচের মাশরাফিকেও খুব মনে আছে অনেকের। দারুণ অধিনায়কত্ব করেছিলেন। দেশের পতাকা মাথায় জড়িয়ে ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়ে আবেগে আন্দোলিত করেছিলেন গোটা দেশকে। কিন্তু ওই ম্যাচের বোলার মাশরাফিকে কজনের মনে আছে? কজনের মনে আছে মাশরাফির উইকেট দুটি? দুটিই ছিল মহাগুরুত্বপূর্ণ উইকেট। অ্যালেক্স হেলস ও জো রুট, দুজনই থিতু হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠছিলেন। দারুণ লেংথ, ছোট্ট সুইং, দারুণ চাতুর্যে দুজনকেই নতুন স্পেলে ফিরে আউট করেছিলেন মাশরাফি।

ম্যাচটি প্রতীকি মাত্র। এটিই আসলে গত বছর দেড়েকের নিয়মিত চিত্র। এই দফার অধিনায়কত্বে নেতৃত্বগুণে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিচ্ছেন মাশরাফি। অধিনায়ক মাশরাফি আড়াল করে দিচ্ছেন বোলার মাশরাফিকে; যে বোলার কিনা নিজের কাজটা দিনের পর দিন করে যাচ্ছেন দারুণ ভাবে।

সাধারণ কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। মাশরাফির ওয়ানডে বোলিং গড় ৩০.৭৬। অথচ শুধু অধিনায়ক হিসেবে ২৮ ম্যাচে গড় আরও ভালো, ২৮.৯১! অধিনায়কত্ব ছাড়া সেই গড় ৩১.১৬। টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়কত্ব ছাড়া খেলা ম্যাচগুলোয় গড় ৩৬.৩৬, অথচ অধিনায়ক হিসেবে ৩২.৮৫! ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন অধিনায়কত্ব না করে ৮.২৯। অধিনায়ক-বোলার মাশরাফি ওভারপ্রতি দিয়েছেন ৭.৪১।

জানলে অনেকেই চমকে উঠতে পারেন, এই দফায় নেতৃত্ব পাওয়ার পর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে মাশরাফির (৩০) চেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন কেবল সাকিব আল হাসান (৩৫)। মানে, অধিনায়ক মাশরাফি দলের সেরা পেসারও। কিন্তু সেই পেসারকে অনেকে মনে রাখেন না অধিনায়কত্বে অতি মুগ্ধতায়।

অনেকে ভুলে যান, বোলার মাশরাফি কতটা ত্যাগ স্বীকার করছেন অধিনায়ক মাশরাফির জন্য। মুস্তাফিজ-আল আমিন-তাসকিনদের মতো তরুণদের জন্য অনায়াসেই ছেড়ে দিয়েছেন নিজের প্রিয় নতুন বলের অধিকার। নতুন বল নিলে, কে জানে, হয়ত আরেকটু বেশি থাকত উইকেট।

পুরোনো বলে ততটা কার্যকর ছিলেন না একটা সময়। তরুণদেরকে নতুন বল দিয়ে নিজে শিখে নিয়েছেন পুরোনো বলের কারুকাজ। চোটের থাবায় গতি তো কবেই হারিয়েছে। কিন্তু সময় মাশরাফিকে করেছে অভিজ্ঞ। এই মাশরাফি দারুণ চতুর এক বোলার, যিনি ব্যাটসম্যানকে পড়তে পারে খুব ভালো এবং দ্রুত। লাইন-লেংথ, ছোট সুইং আর চাতুর্যে ধরেন শিকার।

ভুলে গেলে চলবে না মাশরাফির ব্যাটিংটাও। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মোহাম্মদ আমিরের বলে ওই দুটি বাউন্ডারি, বুধবার ডাচদের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই ছক্কা, এরকম একটি-দুটি শট বা ছোট্ট ইনিংসে রেখে চলেছেন অবদান।

তবে বোলার মাশরাফিই আগে। গত ৭টি ওয়ানডেতে প্রতি ম্যাচেই নিয়েছেন উইকেট। টি-টোয়েন্টি বোলিংটা অতটা ভালো হচ্ছিলো না। এশিয়া কাপ থেকে টি-টোয়েন্টিও দারুণ করছেন। বুধবার তো দারুণ এক স্পেলে গড়ে দিলেন ম্যাচের ভাগ্যই। ম্যাচ শেষে ডাচ অধিনায়ক বলেছিলেন, মুর্তজাই ঘুরিয়ে দিয়েছে ম্যাচ। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহের কণ্ঠেও বোলার মাশরাফি-বন্দনা।

“সে তো আমাকে সব সময় বলে যায় যে এক সময় ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করত। নিশ্চয়ই আরও অনেক ভালো বোলার ছিল তখন (হাসি)। সত্যি বলতে, সে নিজের কাজটা দারুণভাবে করে যাচ্ছে। গত কালের স্পেলটি তো ছিল অসাধারণ, আমাদের ম্যাচে ফিরিয়েছে সে। প্রতিপক্ষকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে।”

৪ ওভারে ১৪ রান দিয়ে ১ উইকেট, টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারেই মাশরাফির সবচেয়ে কিপটে বোলিং। অথচ ম্যাচটি মাশরাফি খেলেছেন পিঠের চোট নিয়ে। সেই কথা বলতে গিয়ে হেসে উঠলেন হাথুরুসিংহে।

“সে গ্রেট স্পোর্টসম্যান। অথচ সে ব্যাথায় ধুঁকছিল, পিঠের ব্যথা নিয়েই খেলেছে। এমন ব্যথা নিয়ে ওরকম বোলিং অবিশ্বাস্য।”

এটাই মাশরাফি। ক্যারিয়ারের শুরুতে গতির ঝড় তুলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ছিলেন অবিশ্বাস্য। ক্যারিয়ারের পথচলায় বাংলাদেশের অনেক অবিশ্বাস্য জয়ের নায়ক। চোটের সঙ্গে নিত্য লড়াইয়ে জয়ী সংশপ্তক। নেতৃত্বগুণে অবিশ্বাস্য। আর ছুরি-কাঁচির অসংখ্য কাটাকাটি সয়ে, শরীর জুড়ে ব্যথা-ধকল বয়ে এখনও যেভাবে বোলিং করে চলেছেন, কোচের ভাষায়ই অবিশ্বাস্য এই বোলার মাশরাফি।

গত কিছু দিনে দেশ-বিদেশের অনেক সংবাদ মাধ্যম, ধারাভাষ্যকাররা বেশ কবার মাশরাফির সঙ্গে তকমা লাগানোর চেষ্টা করেছেন ‘নন প্লেইং ক্যাপ্টেন’। আদতে অধিনায়কত্বের বাইরেও মাশরাফি ‘ভেরি ইম্পর্টেন্ট প্লেয়িং মেম্বার।’

-বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like