টি২০ বিশ্বকাপ ভেন্যুর সাতকাহন

নিউজ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্রিকেট কিংবা অন্য যে কোন খেলাই হোক মাঠ ছাড়া হওয়ার উপায় নেই। সেই মাঠেরও কিন্তু রয়েছে ইতিহাস আর ঐতিহ্য। এই যেমন ধরা যাক, লর্ডসের কথাই। ক্রিকেট ঐতিহ্য মিশে আছে এই মাঠের সঙ্গে। সেদিক থেকে কলকাতার ইডেন গার্ডেনও কম যায় না। বহু কালজয়ী ম্যাচের সাক্ষী এই মাঠ। ২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল হবে ইডেন গার্ডেনই। আসুন টি২০ বিশ্বকাপের ময়দানি লড়াই উপভোগ করার আগে একটু জানার চেষ্টা করি লড়াইয়ের ময়দানগুলো সম্পর্কে…


ইডেন গার্ডেন, কলকাতা

ইডেন গার্ডেন (কলকাতা): ক্রিকেট দুনিয়ায় চতুর্থ এবং ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়ামের নাম ইডেন গার্ডেন। সংস্কার হওয়ার পর বর্তমানে স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণক্ষমতা ৬৬,৩৪৯ জন। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামের দর্শকধারণ ক্ষমতা এক সময় ছিল ১ লাখেরও উপরে। ২০১১ বিশ্বকাপ শুরুর আগেও এর ধারণ ক্ষমতা ছিল ১ লাখ। কিন্তু সংস্কার হওয়ার ফলে ধারণক্ষমতা কমে যায়। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের পূর্বে ইডেন গার্ডেনে একসঙ্গে খেলা দেখতো ১,২০,০০০ দর্শক। যদিও এই তথ্য অফিসিয়ালি নেই। ইডেনে প্রথম টেস্ট হয়েছিল সেই ১৯৩৪ সালের জানুয়ারিতে, ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যে। ওয়ানডে ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দিয়ে, ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ইডেনে আন্তর্জাতিক টি২০ শুরু ২০১১ এর অক্টোবরে। যেখানে ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। ইডেন কেন বিখ্যাত? ১৯৪৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সার্ভিসেস দলের বিপক্ষে আনঅফিসিয়ালি টেস্টে ভারতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয় মুশতাক আলীকে। মাঠেই দর্শকরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন ‘নো মুশতাক, নো টেস্ট’। শেষ পর্যন্ত নির্বাচকরা বাধ্য হন মুশতাককে দলে ফেরাতে। ক্রিকেটের পাশাপাশি ইডেন গার্ডেনে এক সময় ফুটবলও হত। ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্টের কথা। ডার্বি লিগে ইস্টবেঙ্গল-মোহন বাগানের ম্যাচের পর নিহত হন ১৬ জন দর্শক। ১৯৮৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছিল ইডেন গার্ডেনে। যেখানে ইংল্যান্ডকে ৭ রানে পরাভুত করেছিল অস্ট্রেলিয়া। গ্যালারি ভর্তি দর্শক সমর্থন দিয়ে গেছে অসিদের। কারণ সেমিফাইনালে যে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে গিয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারত। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ভারত-শ্রীলংকার মধ্যে সেমিফাইনালে কলঙ্ক গায়ে মাখায় ইডেন। ভারতীয় দল হারছে দেখে স্টেডিয়ামে আগুন লাগিয়ে দেয় কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল দর্শক। এখানেই ১৯৯১ সালে কপিল দেব হ্যাট্টিক করার কৃতিত্ব দেখান। ২০০০/২০০১ মৌসুমে হরভজন সিং টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের হয়ে প্রথম হ্যাট্টিক করেন ইডেন গার্ডেনই। ওই টেস্টেই ক্রিকেট ইতিহাসেই সেরা ইনিংসগুলোর একটি খেলেন ভি ভি এস লক্ষণ (২৮১)। ফলোঅনে পড়েও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই টেস্ট জিতে নেয় ভারত। ফলোঅনে পড়ে জেতার দিক দিয়ে এটি তৃতীয় নজির। আর আধুনিক ক্রিকেটে ম্যাচটি সেরা কামব্যাকের উদাহরণ হয়ে আছে। শচীন টেন্ডুলকার ১৯৯তম টেস্ট খেলেছেন ইডেনে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ম্যাচটি ভারত জেতে ইনিংস এবং ৫১ রানে। ১৩ নভেম্বর, ২০১৪ ইডেনের ১৫০ তম বর্ষপূর্তিতে দর্শকরা দেখেছে রোহিত শর্মার ব্যাটিং তাণ্ডব। তিনি ১৭৩ বলে খেলেছেন ২৬৪ রানের ইনিংস। ওয়ানডে ক্রিকেটে যেটি বিশ্বরেকর্ড।


এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম, বেঙ্গালুরু

এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম (বেঙ্গালুরু): বেঙ্গালুরুর এই স্টেডিয়ামটি কর্ণাটক স্টেট ক্রিকেট এসোসিয়েশনের (কেএসসিএ) হোম গ্রাউন্ড। গত চার দশক কেএসসিএ এর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন প্রয়াত এম চিন্নাস্বামী। শুধু তাই নয়, তিনি বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) প্রেসিডেন্টও ছিলেন ১৯৭৭-১৯৮০ সময়কাল পর্যন্ত। তাই চিন্নাস্বামীর নামে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণক্ষমতা ৩৫,০০০। চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট হয়েছিল ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে। ভারতের বিপক্ষে সেই টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই কিংবদন্তি ভিভ রিচার্ডস এবং গর্ডন গ্রিনিজের অভিষেক হয়েছিল। ক্লাইভ লয়েডের দল ভারতকে হারিয়েছিল ২৫৬ রানের বড় ব্যবধানে। ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মনসুর আলী খান পতৌদি। যিনি টাইগার পতৌদি নামে বিখ্যাত।


ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, মুম্বাই

ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম (মুম্বাই): এই মাঠ ভারতের অন্য সব মাঠের চেয়ে আলাদা হয়ে রয়েছে। কারণ একটাই, এখানেই যে ২৮ বছর পর ২০১১ সালে মহেন্দ্র সিং ধোনির টিম ইন্ডিয়া শ্রীলংকাকে ৬ উইকেটে হারিয়ে ভারতকে বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছে। ওয়াংখেড়ে লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকারের ২০০তম এবং শেষ টেস্ট ম্যাচেরও সাক্ষী। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এই মাঠেই ছয় বলে ছয় ছক্কা মেরেছিলেন রবি শাস্ত্রি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়াংখেড়ের দর্শক ধারণক্ষমতা ৩৩,১০৮।


হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম, ধর্মশালা

হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম (ধর্মশালা): চারদিকে পাহাড় মাঝে স্টেডিয়াম। এখান থেকে বেশি দুরে নয় হিমালয় পর্বত। তাই নিঃসন্দেহে ধর্মশালা চোখ জুড়িয়ে দেবে পর্যটকদের। ধর্মশালা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দালাই লামার জন্য সমধিক প্রসিদ্ধ। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষতা ২৩,০০০। এখানে প্রথম ওয়ানডে হয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয়,২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যে। ম্যাচটি ৭ উইকেটে জিতেছিল ইংল্যান্ড। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ভারতের ৬টি নতুন টেস্ট ভেন্যুর নাম ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ধর্মশালার হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম অন্যতম। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) সিদ্ধান্ত নেয় তাদের এসিসি সেন্টার অব এক্সিলেন্স ধর্মশালায় করার জন্য।


ফিরোজ শাহ কোটলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, নয়া দিল্লি

ফিরোজ শাহ কোটলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম (নয়া দিল্লি): কলকাতার ইডেন গার্ডেনের পর ভারতের সবচেয়ে পুরনো স্টেডিয়াম নয়া দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৩ সালে। এর দর্শক ধারণক্ষমতা ৪১,৮২০। এই স্টেডিয়ামে বিগত ২৮ বছরে একটি টেস্টও হারেনি ভারত। গত ১০ বছরে ওয়ানডেতেও হার নেই। টেস্ট ক্রিকেটে এখনও অবধি মাত্র দুই জন বোলার এক ইনিংসে ১০ উইকেট তুলে নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। একজন ইংলিশ বোলার জিম লেকার, অন্যজন অনিল কুম্বলে। ভারতের লেগ স্পিনার এই কীর্তি গড়েছিলেন ফিরোজ কোটলাতেই, পাকিস্তানের বিপক্ষে। এখানেই সুনীল গাভাস্কারের ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরিকে ছাড়িয়ে রেকর্ড ৩৫তম সেঞ্চুরি করেন কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার। আর গাভাস্কার স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যানের সমান ২৯টি সেঞ্চুরি করেন এই ফিরোজ শাহ কোটলায়। এখানে প্রথম টেস্ট হয়েছিল ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে হয়েছিল প্রথম ওয়ানডে।


পাঞ্জাব ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম, মোহালি

পাঞ্জাব ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম (মোহালি): এই স্টেডিয়াম মোহালি স্টেডিয়াম নামেই বেশি জনপ্রিয়। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামটির দর্শক ধারণক্ষমতা ২৬,৯৫০। এক সময় এখানকার উইকেট ছিল পেসবান্ধব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ভারতের আর সব উইকেটের মতো এখানকার উইকেটও স্পিনবান্ধব হয়ে গেছে। মোহালিতে প্রথম টেস্ট হয়েছিল ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে হয়েছিল প্রথম ওয়ানডে। তবে এখানে বিখ্যাত ওয়ানডে হয়ে আছে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে সেমিফাইনাল ম্যাচটি। ২০১১ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালও হয়েছে এই স্টেডিয়ামে। যেখানে পাকিস্তানকে পর্যদস্তু করেছিল ভারত। ম্যাচটি দেখতে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং পাকিস্তানের ইউসুফ রাজা গিলানি।


বিদর্ভ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম, নাগপুর

বিদর্ভ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়াম (নাগপুর): বিদর্ভ ক্রিকেট এসোসিয়েশন স্টেডিয়ামটি নিউ ভিসিএ স্টেডিয়াম নামেও পরিচিত। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা ৪৫,০০০। এখানে প্রথম টেস্ট হয়েছিল ভারত-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ২০০৮ সালের নভেম্বরে। ওয়ানডে ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয় এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালের অক্টোবরে। সে বছরই একমাত্র টি২০ ম্যাচটি ভারত খেলেছে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে।

-বাংলামেইল২৪ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like