রিজার্ভের টাকা চুরি : দায় কার?

নিউজ ডেস্ক : রিজার্ভ থেকে টাকা চুরির ঘটনায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংক। এই একাউন্ট থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে ১০ কোটি মার্কিন ডলার চুরি হয়ে যায়। একমাস পর গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশিত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোমবার (৭ মার্চ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এর সত্যতা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংক একাউন্ট থেকে এ টাকা হ্যাকাররা নিয়ে যায় বলে দাবি করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

একই দিন ফেরারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা চুরির কোনো সুযোগ নেই। ওই ব্যাংকে থাকা একাউন্ট হ্যাকড হয়নি বলেও দাবি করে তারা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বক্তব্যে বড় ধরনের গড়মিল লক্ষ্য করা যায়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়ার একদিন পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পেতে প্রয়োজনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এ অর্থ চুরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দোষ নেই।’

বিপুল অংকের এই টাকা কোথা থেকে চুরি হয়েছে- সে সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি। কবে, এবং টাকার পরিমাণ কত সে সম্পর্কিত কোনো তথ্যও জানায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে চুরি যাওয়া টাকার একাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রীলঙ্কায় পাচার হওয়া ২শ’ কোটি টাকা ইতোমধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

এদিকে ফিলিপাইনের ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইনকোয়েরে’র গত ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ১০ কোটি ডলার মানি লন্ডারিং হয়েছে। ওই খবরে আরও বলা হয়, দেশটির মাকাতি শহরে অবস্থিত রিজার্ভ কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের একটি শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ ফিলিপাইনে আসে। চীনা হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা সেখানকার কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ অর্থ হাতিয়ে নেয়। হ্যাকার দল এ অর্থ প্রথমে ফিলিপাইনে পাচার করে। সেখান থেকে চুরি হওয়া অর্থের এক অংশ পাচার করা হয় শ্রীলঙ্কায়। ওই অর্থ ফিলিপাইনে স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত হলে সেখানে দুই কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়। তারা ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুদিনে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মানিলন্ডারিং ইউনিট বিষয়টি তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অর্থ চুরির বিষয়টি জানার পর এ ব্যাপারে দ্রুত তৎপরতা শুরু করলেও একমাসের ব্যবধানে হ্যাকার গ্রুপ ছাড়াও দেশের অন্য কেউ এ ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে কিনা কিংবা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ঘটনাটি ঘটেছে তা নিশ্চিত হতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভংকর সাহার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ রয়েছে। তবে আশা করছি খুব শিগগিরিই এর একটা ফলাফল আমরা পাবো।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চুরির ঘটনা তদন্তে কাজ করছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংকের দেয়া গাইড লাইন অনুসরণ করে এ বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।’

এই চুরিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তা এখনো জানা যায়নি বলে জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সন্দেহভাজনদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে এসব হ্যাকাররা অনেক বেশি আপডেটেড। স্থানীয় কারও সহযোগিতা ছাড়াই প্রোগ্রামিং করে এ ধরনের চুরি করতে পারে।’

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকের রিজার্ভ ফান্ডের টাকা চুরি যাওয়ায় শঙ্কিত অনেকে। প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও। একই সঙ্গে এ চুরির দায় নিয়েও। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে টাকা চুরির দায় এখন কার ওপর বর্তাবে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় এক বিদেশি নাগরিকসহ কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অভিযোগের সত্যতাও বেরিয়ে আসে। বিদেশি নাগরিকের দেয়া বিভিন্ন তথ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছিল ব্যাংকিং খাতে। এ ঘটনার রেশ শেষ হতে না হতেই রিজার্ভ থেকে টাকা চুরির মত আরও একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটলো। যা কিনা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা।

-বাংলামেইল২৪ডটকম

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like