জোড়া খুন : সাংসদপুত্র রনির বিচার শুরু

আইন আদালত ডেস্ক : মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির বিরুদ্ধে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে আদালতে।

রোববার ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলার চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। আসামীর অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদন বিচারক সামছুন নাহার নাকচ করে দেন। আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট কাজী নজিবুল্লাহ হিরু শুনানি করেন। আগামী ১১ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত।

এর আগে বেশ কয়েকটি তারিখ চার্জ শুনানির জন্য নির্ধারিত থাকলেও আসামি পক্ষে সিনিয়র আইনজীবীর অজুহাতে তা পিছিয়ে যায়। অবশেষে গত ধার্য তারিখে চার্জ শুনানির জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয। ওইদিন শুনানি হলেও বিচারক আদেশের জন্য ৬ মার্চ দিন ঠিক করেন। অবশেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার বিচার শুর হলো।

গত ২১ জুলাই মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করেন। দাখিলকৃত চার্জশিটে রনিই একমাত্র আসামি।

বখতিয়ারের প্রাডো গাড়ির চালক ইমরান ফকিরসহ তিনজনকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে। ইমরান ফকির ঘটনার সাথে জড়িত না হওয়ায় তাকে মামলার দায় হতে অব্যাহতির সুপারিশসহ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রধান সাক্ষী করা হয়।

মাত্র তিনমাসেই আলোচিত এই মামলার তদন্ত কাজ শেষ করা হয়। চার্জশিটের সাথে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন, পিস্তলের ২১টি তাজা গুলি, গুলি রাখার চার্জার, একটি রক্তমাখা গুলির অংশ বিশেষ, ভিকটিম ইয়াকুব আলীর ও আ. হাকিমের ব্যবহৃত দু’টি লুঙ্গিসহ মোট ১৫টি আলামত আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

চার্জশিটে মোট ৩৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। ওইসময় রনির সাথে গাড়িতে থাকা তার বন্ধু মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল  ও আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দেওয়া জবানবন্দিতে নিজস্ব পিস্তল দিয়ে রনির এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া রনির আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও রনির গুলি করার বিষয়টি আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল, গুলিসহ আসামি বখতিয়ার আলম রনির নামে লাইসেন্সকৃত সকল পিস্তল ও শর্টগানের লাইসেন্স বাতিল করতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবরে আবেদন করা করা হয়েছে। তবে মোট কয়টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করা হয়েছে তার কোন উল্লেখ চার্জশিটে করা হয়নি।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, গত ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাতে তিন বন্ধুসহ রনি শেলবারে মদ পান করে। রাত সাড়ে ১১টায় শেলবার বন্ধ হয়ে গেলে তারা হোটেল সোনারগাঁওয়ে গিয়ে আরও ৯ হাজার ৫০০ টাকার মদ ও বিয়ার পান করে। সেখান থেকে রাত দেড়টায় তারা বাসার পথে রওয়ানা দেন।

এমপিপুত্রের প্রাডো গাড়িটি করে তারা একযোগে রওয়ানা হয়ে বাংলামোটর হয়ে মগবাজার যায়। সেখানে জাহাঙ্গীরকে নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় নিউ ইস্কাটন রোডে ট্রপিক্যাল হোমসের নির্মানাধীন এলএমজি টাওয়ারের সামনে তারা যানজটে আটকা পড়লে বিরক্ত হয়ে রনি তার পিস্তল বের করে এলোপাথাড়ি গুলি করে। গুলির শব্দে মুহূর্তে রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেলে তারা গাড়ি চালিয়ে চলে যায়।

ওই গুলিতে গুরুতর আহত হয় দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সিএনজি চালক ইয়াকুব আলী ও জনৈক রিকশাচালক আ. হাকিম। পরে তারা হাসপাতালে মারা যান।

আপাত সূত্রবিহীন এই মামলায় রনিকে (৪২) গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। প্রতিবার রিমান্ড আবেদন ও মঞ্জুরের পরই জিজ্ঞাসাবাদ এড়ানোর কৌশল হিসাবে অসুস্থতার ভান করেছিল রনি। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গুলি করার কথা জানালেও আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন, রনির গাড়ি চালক ও তিন বন্ধুর আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েই ডিবি এই চার্জশিট দাখিল করেছে।

গত ১৩ এপ্রিল বখতিয়ার আলম রনির এলোপাথাড়ি গুলিতে দৈনিক জনকণ্ঠের সিএনজিচালক ইয়াকুব আলী (৪০) ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম (২৫) গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

১৫ এপ্রিল বিকেলে রিকশাচালক হাকিম মারা যান। এরপর ওই তারিখেই রাতে রিকশাচালক হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম রমনা থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, গাড়ির জানালা দিয়ে একজন লোক এলোপাথাড়ি চার-পাঁচটি গুলি ছুড়েছে।

এরপর গত ২৩ এপ্রিল রাতে মারা যান সিএনজিচালক ইয়াকুব। রনির ছোড়া গুলি ইয়াকুবের বুকে বিদ্ধ হয় এবং হাকিমের পেছনের অংশে ঢুকে নাভির নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

গত ২৪ মে রমনা থানার পুলিশের কাছ থেকে জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা হয়। আপাত সূত্রবিহীন এ মামলাটির তদন্তে নেমে একপর্যায়ে ডিবি জনকণ্ঠ ভবনে স্থাপিত ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজে অনুসন্ধান শুরু করে। ওইখানে মিলে যায় ওই জোড়া খুনের সূত্র। ডিবি দেখতে পায় ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে ওই সড়কে দুবার কালো রঙের একটি প্রাডো গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৬২৩৯) বেপরোয়া চলাচল।

এরপর ডিবি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিপত্র ঘেটে নিশ্চিত হয় যে, কালো রঙের ওই গাড়িটি সাংসদ পিনু খানের। এরপর আধুনিক তদন্ত কৌশল, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি নিশ্চিত হয় যে নিউ ইস্কাটনে ঘটনার আগে ও পরে বখতিয়ার এবং ইমরান অবস্থান করছিল। রনি ওই সময়ে তার মায়ের ওই গাড়িটি ব্যবহার করছিলেন।

এরপর প্রথমে তদন্তকারী কর্মকর্তা রনির গাড়িচালক ইমরানকে শনাক্ত করেন এবং ৩১ মে ইমরানকে আটক করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে ধানমন্ডির বাসা থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

-বাংলামেইল

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like