ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় সন্তানদের খুন!

পরিবার খাবারে বিষক্রিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যুর কথা বললেও ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়ার পর তিন দিন আগের এ ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।  এরপর র‌্যাব দুই শিশুর বাবা, মা, খালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করলে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা।

ওই তিনজনকে ঢাকার র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে দুই শিশুর মা মাহফুজা মালেক জেসমিনের স্বীকারোক্তি আসে বলে এ বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের ভাষ্য।

বৃহস্পতিবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তাদের মা পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের হত্যার কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।”

মাহফুজা কেন তার সন্তানদের হত্যা করেছেন- এই প্রশ্নে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাধারণত এই জাতীয় হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিরোধ বা মানসিক অশান্তির বিষয় থাকে। এ ঘটনাটি কী কারণে হয়েছে তা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হবে।”

অবশ্য র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে সংবাদকর্মীদের পাঠানো এক এসএমএসে বলা হয়, “পারিবারিক জটিলতার জের ধরে ২৯ ফেব্রুয়ারি অনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে রামপুরার বনশ্রীর বাসায় দুই শিশুকে হত্যা করেন তাদের মা।”

এরপর দুপুরে উত্তরার র‌্যাব সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সামনে আসেন মুফতি মাহমুদ খান। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে দুই শিশুর মা মাহফুজা মালেক জেসমিন তার সন্তানদের ‘নিজেই হত্যা করেছেন’ বলে স্বীকার করেন। হত্যাকাণ্ডের বিবরণও তিনি বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন।

“কেন তিনি সন্তানদের হত্যা করেছেন তার কারণ জানতে তদন্ত করেছি। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও ভবিষ্যত নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এর এক পর্যায়ে ছেলেমেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।”

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দুই শিশুর মাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখেছেন তারা। মাহফুজা ‘মানসিকভাবেও সুস্থ ছিলেন’।

তবে এ ঘটনায় দুই শিশুর বাবা পোশাক ব্যবসায়ী আমানুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ র‌্যাব এখনো পায়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

নুসরাত আমান অরণী (১৪) ও আলভী আমান (৬)

হত্যাকাণ্ডের বিবরণে তিনি বলেন, “গত ২৯ ফেব্রুয়ারি মেয়ে অরণীর যখন গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়ছিল, তার মা ও ভাই তখন শোবার ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। গৃহ শিক্ষক চলে যাওয়ার পর মাহফুজা তার মেয়েকেও ঘুমাতে ডাকেন।

“অরণী বিছানায় যাওয়ার পর মাহফুজা তার ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে মেয়ের শ্বাসরোধ করেন। এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে মেয়ে বিছানা থেকে পড়ে যায়। মেয়ের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর ছেলেকেও একইভাবে ওড়না দিয়ে পেচিয়ে হত্যা করেন।”

“প্রথমে সে ঘটনা গোপন করার জন্য স্বামীকে ফোন করে ছেলেমেয়ের অসুস্থতার কথা বলে। আমানুল্লাহ তখন দুই বন্ধুকে বাসায় পাঠায়। বাচ্চাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।”

মানসিকভাবে সুস্থ একজন মা লেখাপড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে কেন নিজের হাতে দুই সন্তানকে হত্যা করতে যাবেন, সে প্রশ্নের সদুত্তর র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে মেলেনি।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এ বিষয়ে একটি মামলা হবে; বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। মামলার তদন্ত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।

“আপাতত যেসব তথ্য পেয়েছি, সেটাই আপনাদের জানালাম। প্রথমে আমরাও বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়টিই বেরিয়ে এসেছে।”

দুই শিশুর মধ্যে ১৪ বছর  বয়সী নুসরাত জাহান অরণী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইস্কাটন শাখার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আর তার ছোটভাই আলভী আমান (৬) পড়তো হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারিতে।

সোমবার রাত ৮টার দিকে রামপুরা বনশ্রীর বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

চাইনিজ রেস্তোরাঁ থেকে আনা খাবার খেয়ে শিশু দুটির মৃত্যুর সন্দেহের কথা পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হলেও পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তে মেলে হত্যাকাণ্ডের আলামত।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল মাহমুদ বলেন, দুটি বাচ্চার গলায় তারা ‘দাগ’ পেয়েছেন। সেখানে আঙুলের ছাপও ছিল। থুতনিসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। দুজনেরেই জিহ্বায় কামড় লেগে ছিল।

এরপর বুধবার জামালপুর থেকে শিশু দুটির বাবা, মা ও খালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে র‌্যাব।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like