শ্রদ্ধেয় বেলাল ভাইয়ের জন্য প্রাণ কাঁদে আমার ॥ আবদুল আজিজ

Aziz pic copyআব্দুল হামিদ শমশের বেলাল। কক্সবাজারের এক প্রতিথযষা সাংবাদিকের নাম। নিভৃতচারি এই সাংবাদিক দুনিয়া ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন গত ৪ ফেব্রুয়ারি। যেখান থেকে ফিরবেন না আর কোন দিন। কিন্তু, সাংবাদিকতায় তার অসামান্য অবদান ভুলবার মত নয়। সততা, ন্যায়, নিষ্ঠা ও নির্ভীক সাংবাদিকতা কাকে বলে তাই তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন হিংসা, বিদ্বেষ ও লোভ লালসার উর্ধ্বে উঠে কিভাবে সাংবাদিকতা করা যায়। যতদিন সাংবাদিকতা করেছেন, ততদিন এসবের মধ্যে থেকেই সাংবাদিকতা করেছেন। এজন্য তিনি ইনকাম সোর্স হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন ব্যবসাকে। নেশা হিসাবে করতেন সাংবাদিকতা। বছর দশেক আগে তিনি সাংবাদিকতাকে গুড বাই জানিয়েছিলেন অপসাংবাদিকতার খাতায় নাম লেখানোর ভয়ে। এ কথা কাউকে বুঝতে দেয়নি নিরবে চলে যাওয়া এই নির্ভিক সাংবাদিক। এ কারনে তার অসংখ্য সহকর্মীদের সাথেও তিনি মিশতেন না। বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন একাকীত্ব জীবনে। শেষ সময়ে এসে নিরবে নিভৃতে চলে গেলেন তিনি। তার চলে যাওয়ার খবরটি শোনার পর থেকে শুধু প্রাণ কাঁদছে সকলের প্রিয় বেলাল ভাইয়ের জন্য।
সেই ১৯৯৬ সালের কোন এক সময়ে শ্রদ্বেয় বেলাল ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। কক্সবাজারের আরেক সিনিয়র সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় তোফায়েল আহমদ আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তার অফিসে (কক্সবাজার জেলা আইনজীবি সমিতির টিন শেড নোটারী অফিস)। বেলাল ভাই ওই সময়ে বাংলাদেশের প্রভাবশালী দৈনিক বাংলার বাণীর জেলা সংবাদদাতা ছিলেন। মুলত শ্রদ্ধেয় তোফায়েল ভাইয়ের অনুরোধেই বেলাল ভাই আমাকে দৈনিক বাংলার বাণীর উখিয়া-টেকনাফ সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে কর্তৃপক্ষ দৈনিক বাংলার বাণীর প্রকাশনা বন্ধ ঘোষনার আগ পর্যন্ত বেলাল ভাইয়ের সাথে কাজ করেছি আমি। সেই থেকে বেলাল ভাইয়ের ডাক পড়লেই চলে আসতাম থানা রাস্তার সৈকত প্রেস কিংবা লালদীঘি পাড়ের জিয়া কমপ্লেক্সের অবিরাম হোটেলে। এসময়ে কোন দিন আমাকে দিতে হয়নি চায়ের বিল কিংবা ভাতের বিল। দৈনিক বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ২০০১ সালে আমি যখন দৈনিক বাঁকখালী পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে কক্সবাজার শহরমুখি হই, তখন আরো বেশী বেলাল ভাইয়ের সান্নিধ্য পেয়েছি, পেয়েছি ভালবাসা, আদর ও ¯েœহ। এই ক্ষদ্র সময়ে তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি তার বহু গুনের প্রতিভা। কখনো কোন খারাপ পরামর্শ দেননি। দিয়েছেন সৎ সাংবাদিকতার পরামর্শ। তার সেই মুল্যবান পরামর্শ আমি এখনো বুকে ধারণ করে চলেছি। চলবো যতদিন এই পেশায় থাকি।
বেলাল ভাইয়ের মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে শহরের বনভবনের উত্তর-পূর্ব কর্ণারে অবস্থিত একটি লন্ড্রীর দোকানের সামনে দেখা হয় তার সাথে। সালাম বিনিময়ের পর আমি তাকে আবারও সাংবাদিকতা পেশায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। মৃদু হাসি দিয়ে বেলাল ভাই বলেছিলেন, এখন কি আর সেই সময় আমার আছে? ‘সময় তো শেষ’। আসলে তিনি কোন সময়ের কথা বলতে চেয়েছিলেন তা আমি তাৎক্ষনিক টের না পেলেও এখন বুঝতে পারছি তিনি কোন সময়ের কথা বলছিলেন। ওই দিন বেলাল ভাইয়ের সাথে প্রায় এক ঘন্টারও বেশী সময় ধরে আমার কথোপকথন হয়েছে। এসময় উঠে আসে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়ার নানান কাহিনীও। আমাকে শুনিয়েছেন তার সাংবাদিকতার নানা অভিজ্ঞতা। কেন এ পেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন জানতে চাইতে সরাসরি তার একটাই জবাব ছিল অপসাংবাদিকতা। শহরের অলিগলিতে বেড়ে উঠা সাংবাদিক নামধারী চামচাদের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন তিনি। কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং পরবর্তি সময়ের নানা গল্প শুনিয়েছেন তিনি। শুনিয়েছেন তার সফলতা ও ব্যর্থতার গল্পও।
গত ৪ জানুয়ারি দুপুরে যখন তার মৃত্যুর সংবাদটি পাই তখন আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না তিনি যে আমাদের মাঝে নেই। সাথে সাথে ছুটে যাই তার বদর মোকামস্থ বাড়িতে। মনে হচ্ছিল তিনি ঘুমিয়ে আছেন নিজ বিছানায়। আমি যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল বেলাল ভাইকে না জাগিয়েই স্বার্থপরের মতো চলে আসা ঠিক হচ্ছে কি?। এখন বার বার মনে পড়ছে আমাদের সকলের প্রিয় বেলাল ভাইকে। মনে পড়ছে তার স্মৃতিময় নানান কথার। এসব কথা মনে পড়তেই যেন আমার প্রাণ কেঁদে উঠে শ্রদ্ধেয় বেলাল ভাইয়ের জন্য। বেলাল ভাই আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসি করুক। এটিই মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা। আমিন।
লেখক: কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি একুশে টেলিভিশন, দৈনিক সকালের খবর, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাট্রিবিউন ও প্রধান প্রতিবেদক দৈনিক বাঁকখালী। ই-মেইল : azizcox2011@gmail.com

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like