ইতিহাস গড়ে সেমিতে বাংলাদেশ

বাংলামেইল২৪: অবশেষে হলো স্বপ্ন পূরুণ। শুক্রবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে নেপালকে ৬ উইকেটে হারিয়ে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশের যুবারা। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে মিরাজ শিবির। সেখানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ পাকিস্তান কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

আগের তিনবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। প্রতিবারই বিদায় নিতে হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই। শেষ চারে খেলার স্বপ্নটা তাই থেকেছে অপূর্ণই। হতে হতে মিলছিল না পরম আরাধ্যের সেমির টিকিট। অথচ ২০০৬ যুব বিশ্বকাপে প্রত্যাশার পারদ ছিল সবচেয়ে উর্ধ্বমুখি। যেখানে ছিলেন মুশফিক-সাকিব-তামিমদের মতো আজকের তারকা সব ক্রিকেটাররা। কিন্তু না। লংকান দ্বীপ রাষ্ট্রে সেবারও ইংলিশদের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ, শেষ পর্যন্ত পঞ্চম স্থানের সাফল্যই প্রলেপ দিয়েছিল বেদনার ক্ষতে। ছোট্ট কাধে বড় বোঝাটা নিতে সেবার পারেননি মুশফিক। তবে নয় বছর পর সেই স্বপ্নটা পূর্ণ করলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। যুব ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠেছে তার নেতৃত্বেই। শুক্রবার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে রূপকথার জন্ম দেয়া নেপালকে ৬ উইকেটে পরাজিত করে নতুন ইতিহাসই গড়ল বাংলাদেশের যুবারা।

ইতিহাসই তো। অনূর্ধ্ব-১৯ বলেই গুরুত্বটা কম মনে হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট বিবেচনা করলে এ যেন নতুন ইতিহাস, নতুন দিগন্তে পথচলার শুরু। ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল। গত বছর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে অনন্য এই অর্জনের শামিল হয়েছিল মাশরাফি এন্ড ব্রিগেড। ভারতকে হারাতে পারলে খেলা হতো প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল। কিন্তু আম্পায়ারদের জোচ্চুরির কারণে তা আর হয়নি। সেই আক্ষেপ এখনও কুড়ে কুড়ে খায় ১৬ কোটি ভক্ত-সমর্থকদের। তবে জাতীয় দল না হোক, এবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেই চমক দেখালো মিরাজ-শান্ত-শাওনরা। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ পৌছে গেল সেমিফাইনালে। যুবাদের এ অর্জন বিস্ময়করই। তবে শুধু ক্রিকেট কেন, বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে যেকোন খেলাতেই বাংলাদেশ উঠতে পারেনি সেমিফাইনাল পর্যন্ত। এবার তা করে দেখিয়েছে মিরাজ শিবিরই। ব্রাভো জুনিয়র টাইগাররা!

নেপালের দেয়া ২১২ রানের লক্ষ্য তাড়া নেমে ব্যাট হাতে নেমে ৯৮ রানে চার উইকেট হারিয়ে রীতিমতো ধুকতে থাকে স্বাগতিকরা। সেই অবস্থা থেকে অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ ও জাকির হাসানের ব্যাটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে বাংলাদেশ। জাকির ও অধিনায়ক মিরাজ উভয়িই হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। দুজনের দায়িত্বশীলতায়ই বাংলাদেশকে বহু কাঙ্ক্ষিত সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয়। পঞ্চম উইকেটে এ দুজন ১১৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন। ৭৭ বল থেকে পাঁচটি চার ও একটি ছক্কায় জাকির করেন ৭৫ রান। আর ৬৫ বলে তিনটি চারের মারে মিরাজ করেন ৫৫ রান।

লক্ষ্যটা মোটামুটি সহজ হলেও বাংলাদেশকে এর জন্যই প্রাণপণ লড়তে হয়েছে। ব্যাট হাতে নেমে শুরুতেই একটা ধাক্কা খেয়েছে মিরাজ বাহিনী। দলীয় ১৭ রানেই ওপেনার সাইফ হাসান ফিরে গেছেন সাজঘরে। সুনীল ধামালার বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন তিনি। এরপর পিনাক ঘোষ ও জয়রাজ শেখ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুজন যোগ করেন ৪৬ রান। তবে ভুল বুঝাবুঝিতে পিনাককে রান আউট হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। আউট হওয়ার আগে ৫৪ বল থেকে দুটি চারের মারে ৩২ রান করেন তিনি। এরপরই স্কটিশদের বিপক্ষে সেঞ্চুরিয়ান নাজমুল হাসান শান্তকে নিজের বলে নিজেই ক্যাচ ধরে সাজঘরে ফেরত পাঠান প্রেম তামাং।

চাপের মধ্যেও ব্যাট হাতে কিছুটা উত্তাপ ছড়াচ্ছিলেন জয়রাজ শেখ। সেই জয়রাজকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে সাজঘরে ফেরান সুনীল ধামালা। যদিও ধামালার এই বলটি লেগ স্ট্যাম্পের বহিঃপ্রান্তের লাইনে ছিল। তাই অনেকটা দুর্ভাগ্যজনকভাবেই ফিরে যেতে হয় তাকে। আউট হওয়ার আগে ৬৭ বল থেকে চারটি চারের মারে জয়রাজ করেন ৩৮ রান। এরপরই জাকির হাসান ও মেহেদি হাসান পঞ্চম উইকেটে জুটি বাঁধেন। নেপালের বোলারদের মধ্যে সুনীল ধামালা দুটি এবং সন্দীপ লামিচানে একটি করে উইকেট নেন।

এর আগে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুক্রবার সকালে টস জিতে শুরুতে ব্যাট করে নেপাল নয় উইকেটে ২১১ রান করে। বাংলাদেশ-নেপাল ম্যাচ দিয়েই শুরু হয়েছে যুব বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই।

বাংলাদেশ অবশ্য শুরুর দিকে নেপালকে অনেকটা চেপে ধরেছিল। তবে শেষ দিকের নৈপুণ্যে মোটামুটি লড়াকু স্কোরই গড়তে সক্ষম হয় হিমালয় কন্যা।  মাত্র ১৭ রানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম উইকেট তুলে নিয়েছিলেন সাইফুদ্দিন। সন্দীপ সুনারকে দলীয় ১৭ রানে বোল্ড করেন তিনি। দুই রানের ব্যবধানে যুগেন্দ্র কার্কি মেহেদি হাসান রানার বলে সাইফের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন। এই দুজনই আউট হন দুই অঙ্ক ছোঁয়ার আগেই।

পরে সুনীল ধামালা (২৫) রান আউট হন। দলীয় ১১৪ রানে আবারো সাইফুুদ্দিন আঘাত হানেন। তার বলে জয়রাজের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে মাঠ ছাড়েন আরিফ শেখ (২১)। এরপর নেপালের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান রাজু রিজালকে থামায় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত শান্ত-জাকিরের যৌথ প্রচেষ্টায় রান আউট হয়ে ফিরেন রাজু। তবে এর আগেই ৮০ বল থেকে আটটি চার ও একটি ছক্কার মারে ৭২ রান করেন তিনি। যা নেপালকে লড়াকু ইনিংস খেলতে সহায়তা করে।

পরে রাজিব সিংহকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন সালেহ আহমেদ শাওন। দুই অঙ্ক ছোঁয়ার আগেই ফিরে যান তিনি। কুশাল বার্টেলও (১৪) পড়েন রান আউটের ফাঁদে। আর দিপেন্দ্র সিং অইরি (২২) বোল্ড হয়ে যান অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজের বলে। ইনিংসের শেষ বলে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে রান আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন সুশীল কান্ডেল। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সাইফুদ্দিন দুটি এবং শাওন, মিরাজ ও রানা একটি করে উইকেট নেন। নেপালের ইনিংসে সবচেয়ে বেশি চারজন ব্যাটসম্যান আউট হয়েছে রান আউটের ফাঁদে পড়ে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like