নিষিদ্ধ হয়েও বিশ্ব কাঁপানো ১০ চলচ্চিত্র

binodon1454176881রাইজিংবিডি : একেক দেশের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন- ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে যৌনতা আর নগ্নতামাখা ছবি দেশে ঢুকতে অনুমতি দিলেও হরর বা অ্যাকশন ঘরানার মুভিগুলো সেন্সরের কাচির তেলায় অবলীলায় পড়ে যায়। এক সময় পশ্চিমা বিশ্বে ব্রিটেনের সেন্সর বোর্ড ছিল সবচাইতে কঠোর। যদিও এ অবস্থা এখনো অনেকটাই রয়ে গেছে।

এ তো গেল হরর বা অ্যাকশনধর্মী মুভির কথা কিন্তু এগুলো বাদেও গুজবের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, চোখে ধুলো দেওয়া, ভুল বোঝানো কিংবা সোজা ভাষায় বিরক্তিকর তকমা দিয়েও বিশ্বব্যাপী অনেক চলচ্চিত্রেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হওয়া ১০ চলচ্চিত্র নিয়ে এ রচনা।

১. ব্যাটলশিপ পটেমকিন (১৯২৫)

এ চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ হয়েছে- ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেনে। সেরগি এনস্টেইন নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি পৃথিবীজুড়ে এখনো ততটাই আন্দোলিত করে, ঠিক যতটা করত ৯০ বছর আগেও। ভালো মানের হয়েও গুজবভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে নিষিদ্ধ বেশ কিছু দেশে। মূলত সমাজতান্ত্রিকতার প্রতি নরম মনোভাবের উদ্রেগ করতে পারে এই ভয়ে কিছু দেশে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়।

২. অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট (১৯৩০)

সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয়েছে- ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি। যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচন্ড শক্তিশালী মনোভাবের এই চলচ্চিত্রটি নাজি শাসকদের পছন্দ হয়নি। সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ও যুদ্ধের ওপর নির্মিত সেরা ছবি মনে করা হলেও চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয় অস্ট্রিয়া, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সে। এখনো ছবির ওপর খানিকটা বিরূপ মনোভাব রয়ে গেছে। তবে সেটা কেবল কয়েকটি দেশেই।

৩. দ্য ইভিল ডেড ( ১৯৮১ )

চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, ইউকে, জার্মানি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডে। স্যাম রাইমি নির্মিত সর্বকালের সেরা এই হরর মুভিটি মুক্তির পরপরই সাড়া ফেলেছিল পুরো পৃথিবীতে। নিজের দেশে ভালো ব্যবসা করে চলচ্চিত্রটি। নির্মাণে খরচের আটগুণ বেশি আয় করে এটি। তারপরও নিষিদ্ধ করা হয় অনেকগুলো দেশে। এখানে কিছু কলেজ ছাত্রর কথা বলা হয়- যারা বেড়াতে গিয়ে খারাপ আত্মার খপ্পরে পড়ে। বেশকিছু দেশে নৈতিকতা, সহিংসতা ও নানারকম অজুহাতে নিষিদ্ধ করা হয় ছবিটি। বাকী দেশে কেটে ছেঁটে প্রদর্শিত হয় সিনেমাটি।

৪. অ্যা সার্বিয়ান ফিল্ম ( ২০১০ )

চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেনে। কী ছিল না এই চলচ্চিত্রে! মারামারি, নৃশংসতা, যৌনতা, নিষ্ঠুরতা- এসবটাই হয়তো একটু কম হয়ে যায় চলচ্চিত্রটির মারাত্মক ভঙ্গীকে বোঝানোর জন্যে। তবে এর ফাঁকে ফাঁকেও ছিল হাস্যরস। আর সেই সাথে সার্বিয়ান সরকারের প্রতি অনেকটাই নেতিবাচক মনোভাব। ফলে নিজের দেশ তো বটেই, পুরো পৃথিবীতেও নানারকম কাঁটাছেড়ার পর মুক্তি পেতে বেশ সমস্যা হয়েছে অ্যা সার্বিয়ান ফিল্মের। আর যাই হোক না কেন, চলচ্চিত্রটি দেখলে আপনি আর সার্বিয়া যেতে চাইবেন না!

৫. স্যালো ( ১৯৭৫ )

স্যালো চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- ইতালি, ফিনল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, নরওয়েতে। পিয়েরে পাওলো পাসোলিনির শেষ ও সেরা মাস্টারপিস হিসেবে খ্যাত এই বিখ্যাত চলচ্চিত্রটিকে সবাই মনে রাখবে। কারণ এতে মানুষকে দিয়ে মানুষের মল গ্রহণ করিয়েছেন পিয়েরে! খুবই সঙ্গতভাবে সেন্সরের কাঁচির তলায় পড়তে হয়েছে চলচ্চিত্রটিকে। আর খুব অবাক ও অদ্ভূতভাবে চলচ্চিত্রটি তৈরির কিছুক্ষণ বাদেই খুন হন পিয়েরে পাওলো। তার খুনের ব্যাপারটা তখন বেশ সাড়া জাগায় ভক্ত মহলে। আর ছবিটিও পৃথিবীজুড়ে সাড়া ফেলে।

৬. অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ ( ১৯৭১ )

চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- আয়ারল্যান্ড, ইউকে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়াতে।অ্যান্থনী বার্গসের এই উপন্যাসকে প্রথমেই খুব একটা ভালোভাবে নিতে পারেননি কেউ। তবে তাতে দমে যায়নি নির্মাতা। তাই তিনি তৈরি করেন এই সমালোচিত উপন্যাসের ভিত্তিতেই দ্বিগুণ বেশি সমালোচনাপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র অ্যা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ। অনেকে মনে করেন, ব্রিটেনের বিবিএফসিই নিষেধ করে দিয়েছিল চলচ্চিত্রটিকে। শোনা গেছে, শেষ পর্যন্ত ছবিটির মুক্তিকে বন্ধ করতে চেয়েছিলেন নির্মাতা স্ট্যানলি নিজেই। কারণ নিজের পরিবারের ওপর একের পর এক মৃত্যুর হুমকি আসতে থাকে। অবশ্য শেষ অব্দি ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। আর বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়েও বেশ ভালো ফল করেছিল।

৭. লাস্ট হাউজ অন দ্য লেফট ( ১৯৭২ )

চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- ইউকে, সিঙ্গাপুর, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, জার্মানি, অষ্ট্রেলিয়াতে। ১৯৬০ সালে অস্কার পুরষ্কার প্রাপ্ত ইঙ্গমার বার্গম্যানের মাইটি দ্য ভার্জিন স্প্রিং এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন ওয়েস ক্র্যাভেন। চলচ্চিত্রটিতে বাজেভাবে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দেখানো হয়। সেই সাথে ভয়ানক সহিংসতা তো রয়েছেই। এ ছাড়াও এতে দেখানো হয়- এমন এক পিতাকে যিনি কিনা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে তাকে হিরোইনে আসক্ত করান। এসব নৈতিক ও নানারকম ঝামেলার কারণে অনেক দেশেই নিষিদ্ধ হয় চলচ্চিত্রটি।

৮. লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস ( ১৯৭২ )

লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয়েছে- ইউকে, চিলি, দক্ষিণ কোরিয়া, পর্তুগাল, অষ্ট্রেলিয়া, ইতালি, কানাডা, সিঙ্গাপুরে। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে নিষিদ্ধ হওয়া এই চলচ্চিত্রটিতে আমেরিকার একজন মাঝ বয়সী হোটেলিয়ার আর সদ্য তারুণ্যে ভরপুর এক তরুণীর ভালোবাসার গল্প নিয়ে গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রটি। মুক্তির পরপরই সবার নেতিবাচক মনোভাবের শিকার হয় ছবিটি। নিজের যৌনাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার মাধ্যম হিসেবে নির্মাতা ছবিটি বানিয়েছেন বলে বিদ্রুপ করেন অনেকে। মূলত, যৌনতাপূর্ণ ব্যাপার থাকার কারণেই একে নিষিদ্ধ করা হয়।

৯. মন্টি পাইথনস লাইফ অব ব্রায়ান ( ১৯৭৯ )

চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হয়েছে- নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ডে। ব্রায়ান কোহেন নামক এক ইহুদীর জীবন নিয়ে তৈরি এ চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয়- এমন একজন মানুষকে, যার জন্ম হয়েছে যিশু খ্রিষ্ট্রের জন্মদিনেই। সারা বিশ্বে মুক্তির পরপরই ঝড় তুলে চলচ্চিত্রটি। পুরো খ্রিষ্টান সমাজে ব্রায়ানের জীবনকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কেবল কি তাই? ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে এটি নিষিদ্ধ হয়। আর বলা হয়, যে এ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করবে সে খ্রিষ্টান ধর্মকে অবমাননা করবে। কেবল ধর্মীয় কারণেই বেশ তোপের মুখে পড়ে এই ধর্মীয় হাস্যরসাত্মক ছবিটি।

১০. আই স্পিট অন ইউর গ্রেভ ( ১৯৭৮ )

সিনেমাটি নিষিদ্ধ হয়েছে- অষ্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ইউকে, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনে। নারীবাদী চলচ্চিত্র হিসেবে বেশ এগিয়ে থাকা এই ছবিটিতে এমন একজনের কথা বলা হয়, যে কিনা একবার খুবই নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণের শিকা হয এবং পরবর্তিতে ধর্ষকদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। পরিচালক এমন একজন ধর্ষিতা নারীকে নিয়ে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। তবে যে কারণে ছবিটি নিষিদ্ধ হয় তা হচ্ছে- এর ভেতরে ঠেসে ভরানো নৃশংসতা আর যৌনতা। যৌনতাকে ঠিক যৌনতা বলা যায় না। কারণ এটি ছিল ধর্ষণ আর ধর্ষনের সময় মেয়েটির নিষ্ঠুর আক্রমণকে এতটাই বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল যে, ছবিটি যে অনেকগুলো দেশেই নিষিদ্ধ হয়।

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like