‘একাত্তরে পাকিস্তানি আর্মিদের কাছে বন্দি ছিলাম’

বাংলানিউজ : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে এই প্রথম মুখ খুললেন আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের। দাবি করেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই তিনি কাজ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
মুসা দাবি করে বলেন, ‘একাত্তরের ২৫ মার্চ আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। এর পরের দিন তিনি আমাদের যার যার এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। আমি নদী পার হয়ে পায়ে হেঁটে ফরিদপুর যাই’।
‘এরপর ২১ এপ্রিল ফরিদপুরে আর্মি ঢুকলো। ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি আর্মির কাছে ধরা পড়ি। তাদের হাতে বন্দি ছিলাম। একাত্তরের ৯ ডিসেম্বর অর্ধমৃত অবস্থায় মুক্তি পাই’।

এদিকে সুইস ব্যাংক ১২ বিলিয়ন জব্দ কেন করেছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ইরেগুলার ট্রানজেকশনের কারণে করেছে। কোর্ট আমার পক্ষে আছেন। শিগগিরই এ বিষয়ে রিপোর্ট পাবো’।
সুইস ব্যাংকের হিসাব তিনি দুদককে দিয়েছেন বলেও জানান মুসা বিন শমসের।
জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ড্যাটকো’র চেয়ারম্যান মুসা বিন শমসের বলেন, দেশে জনশক্তি রফতানিকারকদের যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। অথচ রেমিটেন্সের কারণে দেশের উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘একটা চিংড়ি বিদেশে পাঠালে সোনার মেডেল দেওয়া হয়। কিন্তু যারা দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন, তারা কি পান?’
সুইস ব্যাংকের অর্থ ফেরত এলে দেশে বিনিয়োগ করবেন বলেও জানান মুসা।
এদিকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ থাকায় বাইরে গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে দুদকে প্রবেশ করতে দেখা গেছে মুসা বিন শমসেরকে।
বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের পরিচালক মীর মো: জয়নুল আবেদীন শিবলী। এরপর বাইরে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুসা।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুদকের কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সাংবাদিকদের বলেন, তার (মুসা বিন শমসের) সব তথ্য আমরা পেয়েছি। অনুসন্ধান শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না।
সুইস ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর দিতে মুসা রাজি হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
আপাদমস্তক মূল্যবান অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে নারী দেহরক্ষীসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর বাহিনী নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে এলেও দুদকের ভেতরে একাই প্রবেশ করতে হয়েছে মুসা বিন শমসেরকে। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলেও দুদকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ঢুকতে দেননি। তবে বের হয়ে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় মুসার কয়েকজন সহকারী তার পাশে এসে দাঁড়ান।
কালো রঙের ব্লেজারের সঙ্গে এ সময় তার পরনে ছিল সাদা শার্ট, লাল রঙের টাই এবং সোনালী রঙের রোলেক্সের হাতঘড়ি। পায়ের জুতা হীরায় খচিত ছিল বলে তার বহরে থাকা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
এমন সুসজ্জিতভাবেই সাদা রঙের মার্সিডিঞ্জ বেঞ্জে চড়ে রাজকীয় কায়দায় দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে আসেন মুসা বিন শমসের। দুদকে প্রবেশ করার আগে তার সামনে ও পেছনে একডজন গাড়ি ছিলো। ৬ জন নারী দেহরক্ষীসহ প্রায় ৫০ জনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মকর্তা নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আসেন। বাইরে তার নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে ওয়াকিটকিও দেখা গেছে।
গত ১৩ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে মুসা বিন শমসেরকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা থাকলেও এর একদিন আগেই তিনি ‘ডেথ ফোবিয়া’সহ একাধিক রোগ দেখিয়ে সময়ের আবেদন জানান। সময়ের আবেদন করা কপি দুদকের চেয়ারম্যান, দুই কমিশনার, অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক, পরিচালক এবং অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী বরাবর দেন।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেছিলেন,  ‘তার চাহিদা অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনমাস পেছানো সম্ভব নয়। ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে দুদকে হাজির হতে হবে’।

এরপর ২৮ জানুয়ারি হাজির হতে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা তাকে নোটিশ পাঠান।
সুইস ব্যাংকে ‌‌‌অর্থ আছে কি-না তা যাচাই করতে গত ৪ জানুয়ারি ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরকে দ্বিতীয়বারের মতো তলব করে দুদক। দুদকের পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত একটি নোটিশে তাকে ১৩ জানুয়ারি বেলা ১১টায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। এ নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি সময়ের আবেদন জানান। এ আবেদন আমলে না নিয়ে দুদক ২৮ জানুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হওয়ার সময় বেধে দেয়।
এর আগে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুসাকে প্রথমবার জিজ্ঞাসাবাদ করে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি। ওই জিজ্ঞাসাবাদে সুইস ব্যাংকে তার ১২ বিলিয়ন ডলার অর্থ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এরপর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত বছরের ১৯ মে মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করে দুদক। এ নোটিশের প্রেক্ষিতে ৭ জুন দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন তিনি। সম্পদ বিবরণীতেও তিনি সুইস ব্যাংকে তার ১২ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে) জব্দ অবস্থায় থাকার কথা উল্লেখ করেন।
সুইস ব্যাংকে ৯০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের (বাংলাদেশি প্রায় ৭০০ কোটি টাকা) অলঙ্কার জমার তথ্যও দেন তিনি। এছাড়া দেশে তার সম্পদের মধ্যে গুলশান ও বনানীতে দু’টি বাড়ি, সাভার ও গাজীপুরে এক হাজার ২০০ বিঘা জমির কথাও সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে।
২০১৪ সালের শেষের দিকে মুসার সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক। ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুদক প্রথম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই জিজ্ঞাসাবাদে মুসা হীরার জুতা থেকে শুরু করে আপাদমস্তক মূল্যবান অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন। সঙ্গে ছিল নারী-পুরুষের অর্ধশতাধিক দেহরক্ষীর বহর।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like