ইউপি নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি, মধ্য ফেব্রুয়ারিতে তফসিল

বাংলামেইল : প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনের পর এবার দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সম্পন্ন করতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। ইতোমধ্যেই চেয়ারম্যানপদে দলীয় প্রতীকে ও সদস্যপদে নির্দলীয় নির্বাচনের জন্য বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে কমিশন। বিধিমালা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে ৭শ ইউপিতে নির্বাচন করার জন্য তফসিল ঘোষণা করবে ইসি।

রোববার ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসি সচিব সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ইসিতে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মার্চের শেষের দিকে প্রায় ৭শ ইউপিতে নির্বাচন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে তফসিল ঘোষণা করতে পারে বলে বৈঠক সূত্রে জানা যায়।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ইউপি নির্বাচনের তারিখ পাঁচবছর পূর্ণ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান আছে। এ হিসাবে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুনের মধ্যে সবগুলো ইউপির নির্বাচন শেষ করার বাধ্যবাধকতা আছে। এ কারণে ইসিকে মার্চের মধ্যেই ইউপি নির্বাচন শুরু করতে হবে। তা না হলে আইনী জটিলতা তৈরি হবে।

সর্বশেষ ২০১১ সালে ৩ হাজার ৮০০ ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে মার্চ-এপ্রিল মাসে ৫৩৮টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছিল। এরপর মে মাসে ১৩৪টি, জুন মাসে ৩ হাজার ১৫২টি, জুলাই মাসে ৪০৮টি এবং ১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ৩৪টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছিল। এর বাইরে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১১২টি ইউপিতে নির্বাচন করা হয়।

এবারও মার্চে শুরু হওয়া এ নির্বাচন কয়েক ধাপে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা আছে। শুরুতে যেসব ইউপির মেয়াদ অক্টোবর থেকে মেয়াদোর্ত্তীন হয়েছে এরকম প্রায় সাড়ে ৭শ ইউপির নির্বাচন মার্চের শেষে অনুষ্ঠিত হবে। বাকিগুলো খুচরাভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।

এদিকে, ইউপি নির্বাচনের নির্বাচন বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে ইসি। রোববার তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ইসির আইন শাখার যুগ্ম-সচিব শাহাজাহান খান জানান, রোববার ইউপি নির্বাচনের চূড়ান্ত বিধিমালা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ১৯ তারিখে আচরণ বিধিমালা চূড়ান্ত করার জন্য কমিশন বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই দিন আচরণবিধি চূড়ান্ত হবে।

সংসদ ও পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য ভোটারের সমর্থন তালিকা লাগলেও ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে কোনো শর্ত রাখেনি ইসি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, চেয়ারম্যান পদে দলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে শর্ত রাখার বিষয়ে প্রথমে কমিশনে মতপার্থক্য দেখা যায়। পরে বিষয়টি আলোচনা করে নির্বাচনী এলাকার ভোটার-সমর্থনযুক্ত স্বাক্ষর তালিকা বা অন্য কোনো শর্ত আরোপ না করার ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইসি।

যদিও নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটার সমর্থন প্রয়োজন হত। এছাড়া, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে ১০০ ভোটারের স্বাক্ষারযুক্ত সমর্থন তালিকা দেয়ার বিধান ছিলো।

এ বিষয়ে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, সংসদ ও পৌরসভা নির্বাচন প্রার্থী অনেক কম থাকে, যাচাই করা যায়। কিন্তু সাড়ে চার হাজার ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য কিছু সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিতে হলে তা যাচাই করা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

এমন কঠিন শর্ত দিলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে মাত্র দু’দিন সময় যথেষ্ট হবে না বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, চেয়ারম্যান পদে দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া, দলীয় ব্যয়, দলের ব্যয় রিটার্ন দিতে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন বাতিল, প্রতীক বরাদ্দসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে নির্বাচন আচারণবিধি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে ইসি কর্মকর্তারা জানান।

ইসি সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনবিধি ও আচরণ বিধিমালায় মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হয়ে এলে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করবে ইসি। এরপরই ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝিতে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। আর মার্চের শেষের দিকে শুরু হবে নির্বাচন। কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হওয়া এ নির্বাচন চলবে জুন পর্যন্ত।

এছাড়া, দলীয়ভাবে প্রথমবারের ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে কেন্দ্রভিত্তিক ভোটার তালিকা পাঠাতে উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। আগামী ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকার সিডি উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে ইসি সচিবালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এবার ভোটার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ জন ভোটার।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটার তালিকা হালনাগাদ-২০১৫ শেষে ২ জানুয়ারি ইসির খসড়া তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। হালনাগাদ শেষে এবার নতুন ভোটার হচ্ছেন ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ জন। এরা ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে ভোট না দিতে পারলেও আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সে সুযোগ পাবেন। দেশে বর্তমানে ৯ কোটি ৬২ লাখ ২৬ হাজার ৫৪২ জন ভোটার আছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করলে ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়াবে।

বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ আছে। এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ৪ হাজার ৫৫৩টি ইউপির তালিকা ইসিতে পাঠানো হয়। তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়ন পরিষদগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। আর ইউপিগুলোতে নির্বাচনের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা।

গত নভেম্বরে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন সংশোধন করে চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে এবং সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে নির্দলীয় নির্বাচনের বিধান করা হয়।

উল্লেখ্য, এর আগে দেশে সব মিলিয়ে ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০৩ এবং ২০১১ মোট আটবার ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like