মহানায়িকার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

sen1452983532রাইজিংবিডি : তিনি শুধু পাবনার মেয়ে নন, রূপে আর অভিনয় গুণে হয়ে উঠেছিলেন দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের মহানায়িকা। তিনি সবার প্রিয় রমা সেন, চলচ্চিত্রে যার নাম সুচিত্রা সেন।

আজ ১৭ জানুয়ারি, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী পাবনার মেয়ে এই মহানায়িকার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৪ সালের এই দিনে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার মৃত্যুর ৬ মাসের মাথায় সব আইনি জটিলতা কাটিয়ে পাবনায় উদ্ধার করা হয় অবৈধ দখলে থাকা সুচিত্রা সেনের স্মৃতিবিজড়িত পৈত্রিক ভিটা। কিন্তু উদ্ধারের দেড় বছরেও উদ্ধারকৃত বাড়িতে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ’ গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা তার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে করে হতাশ ও অসন্তোষ ছড়িয়েছে জেলার সাংস্কৃতিককর্মীদের মধ্যে।

এদিকে সুচিত্রা সেনের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ রোববার দুপুরে পাবনা প্রেসক্লাবে সুচিত্রা সেন স্মরণসভার আয়োজন করেছে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ।

তৎকালীন বৃহত্তর পাবনার বেলকুচি উপজেলার সেন ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে নানা রজনীকান্ত সেনের বাড়িতে ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন রমা সেন। সুচিত্রা সেনের দাদার আগের পুরুষদের বাড়ি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলায়। পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্ল¬ার হেমসাগর লেনের একতলা পাকা পৈত্রিক বাড়িতে আজকের সুচিত্রা সেনের শিশুকাল, শৈশব ও কৈশরকাল কেটেছে। বাড়িটির প্রতিটি কক্ষের কোনায় কোনায় জড়িয়ে আছে তার স্মৃতি। কিন্তু বর্তমানে সুনশান নিরবতায় ঝোপ জঙ্গল আর ভঙ্গুর অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই, আগে কতটা জীবন্ত ছিল বাড়িটি।

সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত পাবনা পৌরসভার তৎকালীন সেনেটারি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি করতেন। মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত ছিলেন গৃহিনী। পাবনা শহরের মহাকালী পাঠশালায় পড়ালেখা শেষে সুচিত্রা সেন স্থানীয় পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে (বর্তমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কিছু দিন আগে পারিবারিক প্রয়োজনে সুচিত্রা সেন কলকাতা চলে যান। ১৯৫১ সালের মাঝামঝি সময়ে সুচিত্রা সেনের বাবা করুণাময় দাসগুপ্ত সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। সে সময় জেলা প্রশাসন ঊর্র্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা গোপালপুর মৌজার এসএ ৯৯ খতিয়ানভুক্ত ৫৮৭ এসএ দাগের ০.২১২৫ একর বাড়িটি রিক্যুইজিশন করেন। এরপর থেকে বাড়িটিতে সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বসবাস করতে থাকেন এবং সর্বশেষ ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট।

১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের সময়ে তৎকালনী জেলা প্রশাসক মো. সাইদুর রহমানের সহযোগিতায় জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুস সোবাহানসহ অন্যান্যরা সুকৌশলে বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত করে একসনা লিজ নিয়ে ‘ইমাম গায্যালী ইন্সটিটিউট’ নামের একটি কিন্ডার গার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ সময় বাড়িটির অনেক মূল্যবান ফলজ ও বনজ বৃক্ষ কেটে দখলকারীরা বাড়ির সবুজ বেষ্টনী উজাড় করে দেয়।

এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকেই সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক নিবাসটি জামায়াতের কবল থেকে মুক্ত করে সুচিত্রা সেন আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা করার জন্যে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিরা দাবি তুললেও রাজনৈতিক কারণে বাড়িটি দখলমুক্ত হয়নি দীর্ঘদিন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের কবল থেকে উদ্ধার করে সেখানে সুচিত্রা আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা করার জন্য স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতারা ২০০৯ সাল থেকে আন্দোলন শুরু করেন। গঠন করা হয় সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ।

এর মধ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি মহানায়িকা রমা সেন ওরফে সুচিত্রা সেন। মৃত্যুর আগে তার বাড়িটি উদ্ধার দেখে যেতে না পারলেও মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় একই বছরের ১৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়ি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। পাবনাবাসীর দাবি ছিল বাড়িটিতে সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ করার। কিন্তু নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক ভিটা দখলমুক্ত করার দেড় বছর পার হলেও দখলমুক্ত বাড়িটিতে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ’ করার যে পরিকল্পনা তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এ নিয়ে হতাশ জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

পাবনার সঙ্গীত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মী শেখ তোজা ফাহমিদা চাঁদনী বলেন, সুচিত্রা সেনের মতো এত বড় একজন নায়িকা পাবনার মেয়ে-এটা আমাদের জন্য গর্বের একটি বিষয়। তার সব অভিনয় বা কর্মকা-ে অনুপ্রাণিত হই। আমরা জানি পাবনায় তার পৈত্রিক বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সুচিত্রা সেনের জন্ম বা মৃত্যুদিনে তার বাড়িটিতে আমরা গিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারি না। আমরা চাই বাড়িটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।

গণমাধ্যমকর্মী সরোয়ার উল্লাস বলেন, বাড়িটি উদ্ধারের জন্য এত আন্দোলন, মানববন্ধন, চলচ্চিত্র উৎসব করা হলো। সেই বাড়িটি উদ্ধারও হলো, কিন্তু গত দেড় বছরেও সেখানে কিছু করা হলো না। এতে শুধু পাবনাবাসী নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষ আজ হতাশ। বাড়িটি অবহেলায় পড়ে আছে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো কিছু করা হয়নি। আমরা চাই খুব দ্রুত এই বাড়িটিতে কিছু করা হোক সুচিত্রা সেনের নামে।

একুশে বইমেলা উদযাপন পরিষদ, পাবনার সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, উদ্ধারকৃত বাড়িতে সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ করার যে আবেদন আমাদের ছিল সেই পরিকল্পনা সরকারেরও আছে। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি আমরা লক্ষ্য করেছি। সরকার কখনোই এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করতে চায় না। তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আমরা পাবনার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সহ সবাইকে সাথে নিয়ে আবার নতুন উদ্দোমে চেষ্টা করে বাড়িটিতে সুচিত্রা সেনের নামে আর্কাইভ করার।

সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ পাবনার সাধারণ সম্পাদক ডা. রামদুলাল ভৌমিক বলেন, সুচিত্রা সেনের স্মৃতি ধরে রাখতে তার নামে বাড়িটিতে কিছু একটা করার আমাদের যে দাবি তার সঙ্গে সরকারও একমত। আমরা সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাও দিয়েছি। কিন্তু তার কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি জানান, আমরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা জমা দিয়েছি। সেটি বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছে। কিন্তু সেখান থেকে সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। আর সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত না হলে আর্কাইভ করার কাজটি এগোবে না। আমরা আশাবাদী সরকার দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ করার কাজটি শুরু করবে।

পাবনার জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দীন জানান, আদালতের নির্দেশে সুচিত্রা সেনের পৈত্রিক বাড়িটি দখলমুক্ত হয়ে বর্তমানে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। তবে বাড়িটিতে তী করা হবে সে বিষয়ে সরকার থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আমরা পাইনি। আর খুব শিগগিরই পাবনায় সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like