কক্সবাজার আওয়ামী লীগের সম্মেলন ফের অনিশ্চিত

Cox Alনিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজারটাইমসডটকম, ১৫ জানুয়ারি : আবারও অনিশ্চিয়তার মুখোমুখি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল। প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও এখনো অনুমোদিত হয়নি কাউন্সিলার ও সব উপজেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি। সর্বশেষ মহেশখালী উপজেলা কমিটির সম্মেলন ও কাউন্সিল ঘিরে দোদুল্যমানতা সৃষ্টি হওয়ায় এ শংকা আরও ঘনিভূত হয়েছে। এব্যাপারে শুক্রবারের মূলতবী সভায় সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে মহেশখালীর সম্মেলন আবারো পিছিয়েছে। ১৬ জানুয়ারির পরিবর্তে ১৯ জানুয়ারি সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হলেও স্থান নির্ধারণ হয়নি। ফলে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ফের অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
অন্তত ১০ বারেরও বেশী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু তৎপর প্রার্থীরা ‘নিজেদের মতো গেইম প্ল্যান’ খেলার কারণে পিছিয়ে যায় বার বার। অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়, বিভিন্ন সাংগঠনিক উপজেলা কমিটির সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত না হওয়াকে। কেন্দ্রিয় কমিটির নির্দেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভায় সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ নভেম্বর সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হয়। একই অজুহাতে ওইবারও পিছিয়ে যায়। গত ৯ জানুয়ারী কেন্দ্রিয় কার্য-নির্বাহী কমিটির সভায় আগামী ২৮ জানুয়ারী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
সেই অনুযায়ী আর মাত্র ১২ দিন পরই কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ১১টি সাংগঠনিক উপজেলা কমিটির কাউন্সিলার তালিকা এখনোও অনুমোদিত হয়নি। শনিবার অনুষ্ঠিতব্য মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে অনিশ্চিয়তা দেখা দেয়ায় আবারও জেলা কমিটির কাউন্সিল নির্ধারিত তারিখে সম্পন্ন করা নিয়ে শংকার মাত্রা বেড়েই চলছে। কাউন্সিল ঘিরে তৎপর প্রার্থীদের সাথে কথা বলে এমনটা আভাষ পাওয়া গেছে।
এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মিদের সাথে নির্ধারিত তারিখে কাউন্সিল ও সম্মেলন সম্পন্ন করা নিয়ে কথা হলে তারাও এমনটা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কাউন্সিলের তারিখ কয়েকদিন পেঁছানো এবং স্থান নির্ধারণ নিয়ে মহেশখালী উপজেলা কমিটির নেতা-কর্মিদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ফলে শনিবার অনুষ্ঠিতব্য মহেশখালী উপজেলা কমিটির কাউন্সিল সম্পন্ন করা নিয়েও অনিশ্চিয়তার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২০০৩ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল। সরাসরি ভোটে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত একেএম মোজাম্মেল হক সভাপতি ও সালাহ উদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালের ২৭ মে একেএম মোজাম্মেল হকের মৃত্যু হলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান উখিয়া-টেকনাফ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। কিন্তু বিগত ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে তিনি ওই পদ থেকে অপসারিত হন। সেই থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন দ্বিতীয় সহ-সভাপতি এডভোকেট একে আহমদ হোসেন। তবে ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অন্তত ৯ বছর আগে।
সম্মেলন ও কাউন্সিলের তারিখ পরিবর্তনের এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রিয় কমিটিরই রয়েছে জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা ২৮ জানুয়ারী সম্মেলন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছি। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মূলতবী সভায়ও এব্যাপারে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারীর মধ্যে কাউন্সিলারদের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা কমিটির কাছে অনুমোদন নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শনিবার মহেশখালী উপজেলা কমিটির সম্মেলন সম্পন্ন করা গেলেই জেলা কমিটির কাউন্সিল আয়োজনে আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
কেন্দ্রিয় কমিটির নির্দেশ আর একাধিকবার তারিখ নির্ধারণের পরও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত না হওয়া এবং এবারও অনিশ্চিত পরিস্থিতির কথা জানালে তিনি বলেন, এবার আর পিঁছিয়ে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। কাউন্সিল আয়োজন নিয়ে কেন্দ্রিয় কমিটির কড়া নির্দেশ রয়েছে। কোন কারণে যদি পেঁছাতে হয়, তার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রিয় কমিটিরই।
তবে নিজেকে সভাপতি প্রার্থী দাবি করে সম্মেলন ও কাউন্সিল আয়োজন নিয়ে কোন প্রকার অনিশ্চিয়তা দেখছেন না বলেও তিনি জানান।
মহেশখালী উপজেলা কমিটির কাউন্সিলের তারিখ কয়েকদিন পেঁছানো এবং স্থান নির্ধারণ নিয়ে নেতা-কর্মিদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হওয়ার কথা জানিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি নিয়ে শুক্রবারের জেলা আওয়ামী লীগের মূলতবী সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অন্যবারের মতো কাউন্সিল আয়োজন নিয়ে অনিশ্চিয়তার কথা জানালে এবার আর সেই সুযোগ থাকছে না জানিয়ে তিনি বলেন, জেলা কমিটির বৃহস্পতিবারের মূলতবী সভায় ২০ জানুয়ারীর মধ্যে কাউন্সিলার তালিকা অনুমোদন করে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কাউন্সিল ইলেকশন না সিলেকশনের মাধ্যমে হবে জানতে চাইলে নিজেকে অন্যতম সভাপতি প্রার্থী দাবি তিনি জানান, এটা কাউন্সিলার ও কেন্দ্রিয় নেতৃবৃন্দের মতামতের উপরই নির্ভর করবে।
এতদিন ধরে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত না হওয়াকে নেতৃত্বের অসুস্থতারই লক্ষণ দাবি করে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, এর কেন্দ্রিয় কমিটি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জেলার নেতৃবৃন্দ এতে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কেন্দ্রিয় সিদ্ধান্ত না মানলে অবশ্যই কেন্দ্র তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে কাউন্সিল অধিবেশন হলে আমি সভাপতি পদে প্রার্থী হবো।
কাউন্সিল আয়োজন নিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদের অন্যতম প্রার্থী ও কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুবর রহমানের সাথে কথা হলে বলেন, আমি বরাবরই সম্মেলন আয়োজন করার ব্যাপারে একাট্টা ছিলাম। সংগঠনকে গতিশীল ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে কাউন্সিল আয়োজন সময়েরই দাবি।
কাউন্সিলে প্রার্থী হিসেবে প্যানেলভূক্ত হয়ে নাকি স্বতন্ত্রভাবে অংশগ্রহণ করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বরাবরই কাউন্সিলারদের প্রতি আস্থাশীল। আমরা-তো সবাই আওয়ামী পরিবারেরই সন্তান। কাউন্সিল কি বিএনপি-জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের মধ্যে হচ্ছে নাকি। প্যানেলভূক্ত হয়ে কাউন্সিলে অংশগ্রহণ করতে হবে।
তবে কাউন্সিল সফলভাবে আয়োজনের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনেরও দাবি জানান তিনি।
যখনই জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আয়োজনের তৎপরতা শুরু হয় তখনই সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থী হিসেবে আলোচনার ঝড় তোলেন জেলা কমিটির সদস্য ও তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম। তার সাথে কথা হয় কাউন্সিল আয়োজন ও শংকা নিয়ে।
তিনি বলেন, সম্মেলন সম্পন্ন করা নিয়ে আমরা অনিশ্চিয়তায় আছি। কাউন্সিলারদের তালিকা এখনো অনুমোদন না করাকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মনে করি। তাছাড়া স্থান নির্ধারণ ও মহেশখালী উপজেলা কমিটির সম্মেলন কয়েকদিন পিঁছিয়ে নেয়াকে কেন্দ্র করে আবারও অপতৎপরতা চালাচ্ছে একটি মহল।
বারে বারে কাউন্সিল পিছিয়ে যাওয়ার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়ী করে আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম বলেন, এ দু’নেতা জানেন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে কাউন্সিল অধিবেশন হলে তারা জিতে আসবেন না। পদ-পদবী হারানোর ভয়ে তারা প্রতিবারই কাউন্সিল পিঁিছয়ে নিতে নানা কূটচাল আর ষড়যন্ত্র করেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল ঘিরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হিসেবে মাঠে তৎপর রয়েছেন আরও কয়েকজন নেতা। তারাও পিঁিছয়ে নেই প্রচার-প্রচারণায়। এর মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা সভাপতি পদে এবং সাধারণ সম্পাদক পদে চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাফর আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত একেএম মোজাম্মেল হকের সন্তান ও জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক মার্শেদুল হক রাশেদ, সাবেক সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রদূত অধ্যক্ষ এম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সন্তান ও রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল।
এদিকে, শুক্রবার অনুষ্টিত জেলা আওয়ামীলীগের সভায় মহেশখালী পিছিয়েছে ১৬ জানুয়ারির পরিবর্তে ১৯ জানুয়ারি সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হলেও স্থান নির্ধারণ হয়নি। ফলে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ফের অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সভায় জেলা সম্মেলনের আগে উপজেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন দিতে বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মহেশখালী সম্মেলন ও অন্যন্যা উপজেলা কমিটি অনুমোদনের উপর নির্ভর করছে জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন।

You may also like...

1 Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like