অনিয়ম দূর করতে গঠন করা হচ্ছে ‘ব্যাংক কমিশন’

Abdul_Muhit-ministar-13.01

রাইজিংবিডি : আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়ম দুর্নীতি দূর করতে নতুন একটি কমিশন গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি রোধ সর্বোপরি নজরদারি বাড়াতে ‘ব্যাংকিং কমিশন’ নামে এ কমিশন কঠন করা হবে বলে তিনি জানান।

নতুন এ কমিশন গঠনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে বিশেষজ্ঞ একজন অর্থনীতিবিদকে কমিশনের প্রধান করা হবে। কমিশন ব্যাংকিং খাত পর্যালোচনা করে অনিয়ম, দুর্নীতি রোধে করণীয় সম্পর্কে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে।

চলতি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ব্যাংক খাতের সার্বিক কার্যক্রম ও অবস্থান মূল্যায়নে একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা বলেছিলেন। এবার তারই বাস্তবায়ন ঘটাতে চাইছেন তিনি।

দেশের ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু বড় ধরনের অনিয়মের ফলে আর্থিক খাত নিয়ে সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এবিষয়ে সরকার কি উদ্যোগ নিচ্ছে জানতে চাইলে গত রোববার সচিবালয়ে রাইজিংবিডিকে অর্থমন্ত্রী  বলেন, ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হবে। এটা নিয়ে কাজ করছি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারবো। কারণ, ব্যাংকিং কমিশন গঠন নিয়ে আমি এ মূহুর্তে আলোচনা করছি।

এদিকে অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের বড় বড় অর্জনে কিছুটা কালো ছায়া ফেলে আর্থিক খাতের কয়েকটি কেলেঙ্কারি। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লুট করে নেয়া হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ লোপাটের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলো ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। ঘাটতি দেখা দিয়েছে মূলধনের, আমানতের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। সরকারি ব্যাংকের কালো ছায়া কিছুটা বেসরকারি ব্যাংক খাতেও পড়েছে।

সূত্র জানায়, এ অবস্থায় সরকার পুরো ব্যাংকিং খাতকে নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আর এ উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হবে। কমিশন গঠনের কাজ শুরু করতে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থ বিভাগকে চিঠিও দিয়েছে ব্যাংকিং বিভাগ। ব্যাংকিং বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর পরই অর্থ বিভাগ  কাজ শুরু করেছে। এখন কমিশনের কার্যপরিধি গঠণ নিয়ে কাজ চলছে। এটি শেষ হলেই একজন অর্থনীতিবিদকে প্রধান করে কমিশন গঠন করা হতে পারে।

ব্যাংকিং কমিশনের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখন ব্যাংকিং কমিশনের টার্মস অব রেফারেন্স তৈরি নিয়ে কাজ হচ্ছে। এটি শেষ হলেই মূল কাজে হাত দেওয়া হবে। আশা করছি, আগামী জুনের আগেই ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা সম্ভব হবে।

ব্যাংক কমিশনের কাজ বর্তমানে শুরু হলেও চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের আগেই এটি নিয়ে পরিকল্পনা হয়। সরকারি ব্যাংকগুলোর বেহাল অবস্থাই ব্যাংক কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটেছে এ খাতে। এই সময়ে সরকারি মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীরা অর্থ আত্মসাতের জন্য বেছে নিয়েছেন জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে। আর বেসিক ব্যাংক তো পুরো সময় জুড়েই ছিল কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। বিশ্বব্যাংক ২০১৩ সালের শেষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে তৈরি করা এক প্রতিবেদনেও বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

সরকারি ব্যাংগুলোর বর্তমান এ অবস্থার জন্য সুশাসনের অভাব এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগ দেওয়াকেই বেশি দুষছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে এখনো সুশাসনের অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আর রাজনৈতিকভাবে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমরা চেয়েছিলাম যে, সাধারণ মানুষ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ এসব মানুষ লোভে পড়ে যান। এর ফলে ব্যাংকে খেলাপি ঋণসহ নানা অসুবিধা তৈরি হয়েছে। এই বিষয়টি আমরা বুঝিনি। এটা ছিল একটা বড় ভুল। এ ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংক কমিশন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, ব্যাংকিং খাতের উল্লেখযোগ্য প্রসার ইতিমধ্যে হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই খাতের সঞ্চায়ন, সুষ্ঠু নীতিমালা ও প্রবৃদ্ধির ধারা নির্ধারণ। ব্যাংকিং খাতের প্রচলিত কার্যক্রম এবং এই খাতের সার্বিক অবস্থান মূল্যায়ন ও বিবেচনা করার জন্য একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের চিন্তা-ভাবনা আমাদের রয়েছে।

ব্যাংকিং কমিশন গঠন নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যে আইন ও ক্ষমতা আছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ হলেই ব্যাংকিং খাত ঠিক থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মানার কারণেই ব্যাংক খাতে বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

 

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like